শুঁটকির মৌসুমে ব্যস্ত দুবলার চর, নিয়ন্ত্রণে ‘সিন্ডিকেটের’ অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম : খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের তীরে জেগে ওঠা দুবলার চরে শুরু হয়েছে শুঁটকির ভরা মৌসুম। নভেম্বর থেকে মার্চ—টানা পাঁচ মাস কয়েক হাজার জেলে ও শ্রমিকের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকে এই চর। শত কোটি টাকার শুঁটকি বাণিজ্য হলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সেবার অভাবে জেলেদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, শুঁটকি পল্লীর পুরো বাণিজ্য একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে।

দুবলার চর সুন্দরবনের দক্ষিণে অবস্থিত একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে জেগে ওঠা ও তলিয়ে যাওয়া এই চরে প্রতি মৌসুমে সাময়িক বসতি গড়ে তোলেন বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কয়েক হাজার জেলে ও শ্রমিক। সাগর ও সুন্দরবনের সংলগ্ন নদী থেকে ধরা মাছ এখানে এনে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

জেলেদের ভাষ্য, মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার জেলে মাছ ধরা ও শুকানোর কাজে যুক্ত হন। রূপচাঁদা, লইট্টা, ছুরি, খলিসা, ভেদা, চিংড়িসহ অন্তত ৮৫ প্রজাতির মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি হয়। এখান থেকে শুঁটকি দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে, বিশেষ করে চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জে পাঠানো হয়।

বন বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদন থেকে প্রায় ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলেদের জন্য ৯৮৫টি অস্থায়ী ঘর ও ৬৬টি ডিপো তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতি কুইন্টাল শুঁটকির ওপর নির্ধারিত হারে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে।

তবে জেলেদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, শুঁটকি পল্লীর বাণিজ্য কার্যক্রম মূলত কয়েকজন প্রভাবশালীর নিয়ন্ত্রণে। তাদের অনুমতি ছাড়া মাছ ধরা, বিক্রি কিংবা শুঁটকি বাজারজাত করা কঠিন। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগ থেকে মাছ ধরার লাইসেন্স মূলত প্রভাবশালীদের হাতেই থাকে। জেলেরা সরাসরি লাইসেন্স না পেয়ে তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, মহাজন ও জেলেদের কাছ থেকে দাদন, টিকিট ও বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় করা হয়। বাজারদর জানার সুযোগ না থাকায় অনেক সময় কম দামে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, ঝড়-জলোচ্ছাসের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটও প্রকট।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা জেলে ও শুঁটকি ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা দিয়ে আসছি। এখানে কোনো চাঁদাবাজি নেই। জেলেরা নিরাপদেই মাছ ধরতে পারছেন।’

দুবলার চরের ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা প্রহ্লাদ চন্দ্র রায় বলেন, শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ও ঘর নির্মাণের জন্য ১৫ জনের নামে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। তাদের মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোনো অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নুরুল করিম বলেন, ‘শুঁটকি মৌসুমে দুবলার চরে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য থাকে। জেলেদের বন বিভাগের নিয়ম মেনে কাজ করতে হচ্ছে। রাজস্ব আদায় ও পরিবেশ সুরক্ষায় আমরা নজরদারি করছি।’

সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হলেও দুবলার চরের শুঁটকি শিল্পে শাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি সহায়তার ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, সরকারি উদ্যোগ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই শুঁটকি শিল্প থেকে দেশীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখা সম্ভব।