রেলের ইঞ্জিন সংকটে রংপুরে তেলের হাহাকার, পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ লাইন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

রংপুর, প্রতিনিধি : রেলের ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলায় তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও পেট্রোলপাম্প বন্ধ, কোথাও সীমিত বিক্রি—আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। এতে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার পেট্রোলপাম্পগুলোতে সাধারণত রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ওয়েল কোম্পানির মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। এসব কোম্পানির রংপুর রেল ডিপোগুলোতে চট্টগ্রাম থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৯টি র‌্যাক (প্রতি র‌্যাকে দুটি ওয়াগন) তেল আসত। তবে বর্তমানে সেই সরবরাহ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

রংপুর রেল ডিপোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মিটারগেজ লাইনে রেলের ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম থেকে তেল পরিবহন কার্যত বন্ধ। মেঘনা ডিপোতে সামান্য মজুত থাকলেও পদ্মা ও যমুনা ডিপোতে গত এক সপ্তাহ ধরে কোনো তেল সরবরাহ হয়নি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, রংপুরের তিন ডিপোতে মাসে অন্তত আড়াই কোটি লিটার জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। অথচ গত বছরের আগস্টে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২১ লাখ লিটার, যা মোট চাহিদার এক-চতুর্থাংশেরও কম। ফলে অনেক পাম্প মালিক বাঘাবাড়ী ও পার্বতীপুর থেকে অতিরিক্ত খরচে তেল এনে কোনোভাবে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন।

যমুনা ওয়েল কোম্পানির রংপুর রেল ডিপোর ইনচার্জ শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘রেলের ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম থেকে তেল আনা যাচ্ছে না। পার্বতীপুর ডিপোতে খুলনা থেকে ব্রডগেজ লাইনে তেল আসে। ওই লাইনটি যদি আরও প্রায় ৫০ কিলোমিটার সম্প্রসারণ করে রংপুর পর্যন্ত আনা যায়, তাহলে এ সংকট অনেকটাই কমে যাবে।’

রংপুর জেলা পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, বিভাগের ৮ জেলায় প্রায় ৩৮০টি পেট্রোলপাম্প রয়েছে। যেসব পাম্পে নিয়মিত বরাদ্দ আসছে, তারা সীমিত আকারে তেল বিক্রি করছে। তবে অনেক পাম্পে বরাদ্দ কম বা অনিয়মিত হওয়ায় দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং পরবর্তী সরবরাহ না পাওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

রংপুরের আজাদ ফিলিং স্টেশনের মালিক মঞ্জুর আজাদ বলেন, ‘রেলের র‌্যাক না আসায় তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ। বিকল্পভাবে তেল আনতে পরিবহন খরচ অনেক বেশি, তাই অনেকেই তেল আনতে পারছেন না।’

অন্যদিকে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় পরিবহন খাতে কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব পড়েছে। রংপুর বিভাগীয় দাহ্য পদার্থ বহনকারী ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলাউল মিয়া লালু বলেন, ‘তেল সরবরাহ না থাকায় প্রায় ৬০০ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’

রেলের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলিয়ে মোট ২৯৭টি ইঞ্জিন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। ফলে সীমিত সংখ্যক ইঞ্জিন দিয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে।

রংপুর জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে জেলায় ডিজেল মজুত ছিল প্রায় ১০ লাখ লিটার, পেট্রোল ১৭ লাখ লিটার এবং অকটেন ৪২ হাজার লিটার। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, পদ্মা ও যমুনা ডিপো প্রায় তেলশূন্য, মেঘনায় সামান্য মজুত রয়েছে।

রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘সংকট নিরসনে আমরা কাজ করছি। পাম্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠক হবে। একই সঙ্গে অ্যাপভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে একজন একদিনে একাধিকবার তেল নিতে না পারেন। এতে কিছুটা চাপ কমবে বলে আশা করছি।’

এদিকে হঠাৎ তেলের সংকটে পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে তারা মনে করছেন।