ভেনামি জাত ও ক্লাস্টার পদ্ধতি চিংড়ি চাষে আনবে সাফল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের একসময়কার শীর্ষ পণ্য চিংড়ি গত কয়েক বছরে নানা সংকটে পড়েছে। ভাইরাসের আক্রমণ, জলবায়ুর পরিবর্তন ও উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় এ খাতটি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনামি জাতের চিংড়ি ও ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চাষাবাদই পারে আবারও এই শিল্পে সাফল্য ফিরিয়ে আনতে।

সরেজমিন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন ঘেরগুলো ঘুরে দেখা গেছে, গত ১৪ বছর ধরে চিংড়ি চাষে চাষিদের কম-বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আইলা, করোনা মহামারি ও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতায় (রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ) রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় তারা পুরোনো অবস্থানে ফিরতে পারছেন না।

১০ বিঘার ঘেরে চাষ করা বকুল বলেন, ‘গত বছর দামে কম, এ বছর উৎপাদনে কম। দেরিতে বৃষ্টি হওয়ায় ভাইরাসের প্রকোপ বেড়েছে।’ স্থানীয় ঘের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবনসংলগ্ন ৯০ শতাংশ ঘের মালিক এ মৌসুমে লাভ নয়, খরচ ওঠে গেলেও খুশি। লিজ নিয়ে যেসব ঘের যান্ত্রিকভাবে পানি ওঠানো হয়, সেগুলোতে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, গত সাত বছর ধরে চিংড়ি রপ্তানি কমছে ধারাবাহিকভাবে। ২০১৫–১৬ অর্থবছরে ৪০ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি হলেও ২০২১–২২ সালে তা নেমে এসেছে ৩০ হাজার টনে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রপ্তানি আরও কমতে পারে।

তবে সুখবরও আছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২২’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চাষের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় স্থানে। মৎস্য খাত প্রতি বছর ৭০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য রপ্তানি করছে।

দ্রুত বর্ধনশীল ভেনামি বা “হোয়াইটলেগ শ্রিম্প” বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত চিংড়ির ৮০ শতাংশ। বাংলাদেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২২ সালে এর বাণিজ্যিক চাষের অনুমতি দেয় সরকার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু ঘেরে ইতিমধ্যে ভেনামির চাষ শুরু হয়েছে।

ভেনামি অন্যান্য জাতের তুলনায় দ্রুত বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। তবে এর চাষে জৈব নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগনিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

রপ্তানিকারকদের মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনায় ভেনামি চাষ দেশের চিংড়ি রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করতে পারে।

সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ক্লাস্টার হলো একই অঞ্চলে পরস্পর-সংযুক্ত একাধিক খামারের সমষ্টি। এ পদ্ধতিতে চাষ করলে—

উৎপাদন বাড়ে,

রোগবালাই কমে,

পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হয়,

মানসম্মত উৎপাদনসামগ্রী কম খরচে পাওয়া যায়,

খামারগুলোর জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হয়।

তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সনাতনী পদ্ধতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আধুনিক ও মিশ্র পদ্ধতির চাষ সময়ের দাবি।’

বিগত বছরগুলোতে ঘেরের উৎপাদনব্যয় বেড়েছে, জমির লিজদরও বেশি। নদী থেকে সরাসরি পানি আনা সনাতনী ঘেরগুলোতে কিছু সাদা মাছ মেলে বলে ক্ষতি পোষানো যায়। কিন্তু লিজ নিয়ে যেসব ঘেরে ‘হাড়ি পদ্ধতি’ (সেচ দিয়ে পানি আনা) ব্যবহার করা হয়, সেগুলোতে উৎপাদনব্যয় অনেক বেশি পড়ছে।

সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জ থাকলেও ভেনামি জাত ও ক্লাস্টার পদ্ধতি—দুটি আধুনিক প্রযুক্তিই চিংড়ি শিল্পকে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।