
সিরাজুল ইসলাম : প্লাস্টিক পণ্যের আগ্রাসন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সাতক্ষীরার শতবর্ষী মাদুর শিল্প। একসময় জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই লোকজ শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। আয় কমে যাওয়ায় অনেক কারিগর ইতিমধ্যে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাতক্ষীরার মাদুরের ব্যাপক চাহিদা ছিল। জেলার আশাশুনি ও তালা উপজেলায় ‘মেলে’ বা পাতি চাষ হতো ব্যাপকভাবে, যা মাদুর তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তখন এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে।
বর্তমানে বাজার দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিকের মাদুর। কম দাম, সহজলভ্যতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে ক্রেতারা প্লাস্টিকের দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে লবণাক্ততার প্রভাবে জমিতে মেলে চাষ কমে গেছে। ফলে কাঁচামালের সংকট ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এতে লাভ কমে যাওয়ায় কারিগরদের আগ্রহও কমছে।
তবুও জেলার প্রায় ৩০০ পরিবার এখনো এই শিল্প টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি মাদুরগুলো শুধু দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী নয়, বরং একটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক।
আশাশুনি উপজেলার এক কারিগর বলেন, “এই কাজই আমাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। কিন্তু এখন মাদুর বিক্রি করে সংসার চালানো খুবই কঠিন। প্লাস্টিক মাদুরের কারণে আমরা ন্যায্য দাম পাই না।”
তালা উপজেলার আরেক কারিগর জানান, বয়সের কারণে অন্য কোনো কাজ করতে না পারায় বাধ্য হয়েই এই পেশায় আছেন। “মেলে কিনতে হয় ধার করে। পরে মাদুর বিক্রি করে সেই টাকা শোধ করতে হয়। শেষে হাতে খুব সামান্যই থাকে,” বলেন তিনি।
কারিগরদের মতে, একটি মাদুর তৈরিতে মেলে ও পাটের দড়ি মিলিয়ে খরচ পড়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা। একটি মাদুর তৈরি করতে সময় লাগে এক থেকে দুই দিন। সপ্তাহে তিন থেকে চারটি মাদুর তৈরি করা সম্ভব হলেও বাজারদর অনুযায়ী আয় খুবই সীমিত। ছোট নামাজি মাদুর ১০০ টাকা থেকে শুরু করে বড় মাদুর ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে, বর্তমানে সাতক্ষীরায় প্রায় ৩০০ পরিবার সরাসরি এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তবে পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে এই সংখ্যাও আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা বিসিকের প্রমোশন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “প্লাস্টিক মাদুরের কারণে ঐতিহ্যবাহী মেলে মাদুরের চাহিদা কমেছে, ফলে কারিগরদের আয়ও কমে গেছে। তবে বিসিকের পক্ষ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কারিগররা চাইলে তাদের উৎপাদন বাড়াতে পারেন।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার উদ্যোগ জরুরি।
