
লবণাক্ততা, ভাঙন আর অনিশ্চয়তায় বদলে যাচ্ছে সাতক্ষীরার জনপদ
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে এখন সবচেয়ে বড় সংকট—সুপেয় পানি। লবণাক্ততার দাপট, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত আর ভাঙন আতঙ্কে বিপর্যস্ত মানুষ ধীরে ধীরে ছেড়ে যাচ্ছে তাদের ভিটেমাটি। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী এলাকায় এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের সুন্দরবনসংলগ্ন মালঞ্চ নদীর তীরে বেড়িবাঁধের পাশে বসবাস করেন সুফিয়া বেগম। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলেকে নিয়ে তার জীবনসংগ্রাম থেমে নেই। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে পরপর কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ে তিনবার তার ঘর ভেঙেছে। প্রতিবারই নতুন করে ঘর তুলতে হয়েছে।
কিন্তু ঘর ভাঙার চেয়েও বড় সংকট এখন পানির।
সুফিয়া বেগম বলেন, “খাওয়ার পানির জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। বৃষ্টির পানি জমিয়ে রেখে কোনো রকমে চলি। এই পানির কারণেই শরীরে নানা রোগ হয়েছে।”
মুন্সিগঞ্জ ও আশপাশের নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত প্রায় সব পরিবার একই সমস্যায় ভুগছে। খাবার পানির জন্য দূরের পুকুর বা সংরক্ষিত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। লবণাক্ত পানির কারণে অনেকেই চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যাদের সামর্থ্য আছে তারা ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়ে শহরে চলে গেছেন। যাদের যাওয়ার সুযোগ নেই, তারাই কষ্ট করে টিকে আছেন।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামে একসময় তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করত। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণ পানি প্রবেশ করে এবং কয়েক মাস ধরে জোয়ার-ভাটা চলতে থাকে। বর্তমানে সেখানে রয়েছে মাত্র ১২০টি পরিবার।
গ্রামবাসী আলতানুর গাজী বলেন, “আগে এখানে ধান চাষ হতো। এখন সব জায়গায় লবণ পানির চিংড়ি ঘের। খাওয়ার পানির কোনো উৎস নেই। দেড় কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়।”
তিনি জানান, অনেকে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
সাতক্ষীরার আরেক উপকূলীয় উপজেলা আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নেও একই চিত্র। ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের সময় বাঁধ ভেঙে কয়েকটি গ্রামে দীর্ঘ সময় জোয়ার-ভাটা চলেছে। বর্তমানে বাঁধ সংস্কার করা হলেও জোয়ার এলেই আতঙ্কে থাকেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য তৌসিকে কাইফু বলেন, “আমাদের অভাবের চেয়ে আতঙ্ক বেশি। বাঁধ ভেঙে গেলে সব শেষ হয়ে যায়। ত্রাণ নয়, আমাদের দরকার টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ।”
শ্যামনগরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিডিওর পরিচালক গাজী আল ইমরান বলেন, উজানের পানি না আসায় নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানও নেই।
তার মতে, “সুপেয় পানি সংকট ও বেড়িবাঁধের অনিশ্চয়তা—এই দুই কারণেই মানুষ এলাকা ছাড়ছে।”
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, আইলার পর থেকেই উপকূলীয় এলাকার চিত্র বদলে গেছে। অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের জন্য লবণ পানি প্রবেশ করানোয় কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধ ভেঙে লবণ পানি ঢুকে মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সুপেয় পানির অভাব এখন বড় সংকট। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মানুষ আরও বেশি করে এলাকা ছাড়বে।”
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আফরোজা আক্তার বলেন, উপকূলবাসীকে রক্ষায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গাবুরা ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৯ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। ইতোমধ্যে ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, “আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হলে গাবুরার চিত্র বদলে যাবে। পাশাপাশি খাল খনন, পুকুর খনন, পানি সংরক্ষণ ও আধুনিক পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা আরও বাড়তে পারে। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির নিশ্চয়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করা গেলে উপকূলের জনপদ ক্রমেই জনশূন্য হয়ে পড়বে।
