
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : প্রচণ্ড শীতল হাওয়া, ঘন কুয়াশা আর দীর্ঘদিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞায় বিপাকে পড়েছেন সুন্দরবননির্ভর অন্তত ৫০ হাজার বনজীবী। শীতের তীব্রতা ও জীবিকার পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের বনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে চরম মানবিক সংকট।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর, খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা অন্তত অর্ধশত গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি নির্ভরশীল বনসম্পদের ওপর। মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, গোলপাতা কাটা ও মধু সংগ্রহ—এই চারটি কাজই এসব এলাকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস। তবে শীতের প্রকোপ, নদীতে মাছ ও পোনা কমে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে বন বন্ধ থাকায় এখন অনেকেই বনে যেতে পারছেন না।
শ্যামনগর উপজেলার মৎস্যজীবী সমিতির নেতা মধু জিৎ রপ্তানি জানান, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে কোনো বনজীবীই বনে যেতে পারছে না। হিমেল হাওয়ায় নদীতে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।’
স্থানীয় বনজীবীরা জানান, বছরের একটি বড় সময় কর্মহীন থাকতে হয় তাঁদের। নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকার থেকে যে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়, তা পর্যাপ্ত নয়। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, ‘সরকারিভাবে কিছু চাল বিতরণ করা হয়েছে, কিন্তু শীতবস্ত্র বা বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক বনজীবী এই সহায়তার তালিকার বাইরেও রয়ে গেছেন।’
কয়রা উপজেলার কাটকাটা গ্রামের অবনী মণ্ডল বলেন, ‘বনে গেলে এখন আর পেট চলে না। শহরে কাজ করতে গেলে মন টেকে না। আবার বনে যেতে ভয় লাগে—দস্যু আর বন বিভাগের কড়াকড়ি দুইটাই আছে।’
দাকোপ উপজেলার বরইতলা এলাকার আলেয়া আক্তার জানান, তাঁর স্বামী প্রতিবছর মধু সংগ্রহে বনে যান, আর তিনি নদীতে চিংড়ির পোনা ধরেন। বলেন, ‘ছেলেকে লেখাপড়া শেখাচ্ছি, যেন আমাদের মতো জীবন তার না হয়। আমরা তো প্রতিদিন বাঘের ভয় নিয়ে বাঁচি।’
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, ‘বন এখন কঠোর নিরাপত্তার আওতায় রয়েছে। পাস পারমিট ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রকৃত বনজীবী ও মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষদের ক্ষেত্রে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন সিডিও ইয়ুথ টিমের সভাপতি গাজী আল ইমরান বলেন, ‘সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা জরুরি। তবে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকলে বনজীবীরা বাধ্য হয়ে নিয়ম ভাঙবে। এতে বনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, মানুষও নিঃস্ব হবে।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়—বনজীবীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রয়োজন। নইলে সুন্দরবন রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে এই বনকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন ও পেশা হারিয়ে যাবে।
