দখল-দূষণে মৃতপ্রায় ভুলুয়া নদী, বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও কৃষিক্ষতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

নিজস্ব প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুর : দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যবাহী ভুলুয়া নদী। একসময় প্রায় ৫০০ মিটার প্রশস্ত এ নদীর প্রস্থ এখন অনেক স্থানে নেমে এসেছে মাত্র ৮৫ মিটারে। প্রায় ৪০০ মিটারের বেশি অংশ দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই বিস্তীর্ণ এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় নদীটিতে বড় বড় নৌকা চলাচল করত এবং মাছ ধরেই বহু জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং পলি জমার কারণে নদীর নাব্যতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে অনেক জায়গায় নদী হেঁটে পার হওয়াও সম্ভব হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ-উজ-জামান খান জানান, বৃহত্তর ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা ও বন্যা নিরসনে একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এতে ভুলুয়া নদী খননকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

প্রায় ৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী বেগমগঞ্জ উপজেলা থেকে শুরু হয়ে লক্ষ্মীপুর সদর, কমলনগর ও রামগতি উপজেলা অতিক্রম করে মেঘনা নদী-এ গিয়ে মিলিত হয়েছে।

চরকাদিরা এলাকার সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল্লাহ খালেদ বলেন, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি নামতে পারে না। এক-দুই বছর পর্যন্ত জলাবদ্ধতা স্থায়ী থাকায় জমিতে ফসল আবাদ করা সম্ভব হয় না। নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, তীর দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চরকাদিরা, আন্ডারচর ও তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের হাজার হাজার একর জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

স্থানীয় কৃষক সবুজ হোসেন, তাজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান বলেন, একসময় ভুলুয়া নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনেকে। এখন প্রভাবশালীদের দখল ও বাঁধের কারণে নদীর অস্তিত্বই সংকটে পড়েছে।

কমলনগরের সাংবাদিক সুমন উদ্দিন বলেন, নদীতে পানি না থাকায় ইরি-বোরো চাষ ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় তিন হাজার হেক্টর ফসলি জমি পতিত পড়ে আছে। দ্রুত অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ ও নদী খননের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

চর কাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নিজাম উদ্দিন বলেন, নদী খননের অভাব ও দখলদারদের কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি বারবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন পাঠান বলেন, ভুলুয়া নদীর খনন ও সংস্কার হলে এ অঞ্চলের কৃষিতে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং হাজারো কৃষকের ভাগ্য বদলাবে। নদীর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাহাত উজ জামান বলেন, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর প্রমত্ত রূপ ফিরিয়ে আনতে পৃথক প্রকল্প গ্রহণ প্রয়োজন।