দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলবদ্ধতা ও কৃষি বিপর্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ১২ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা ‌: বিভিন্ন গণমাধ্যমের ‌শনিবারের সংখ্যায় ‘সাতক্ষীরায় টানা বৃষ্টিতে ৩ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ডুবেছে’, ‘কয়রায় জোয়ার ঠেকাতে বাঁধের ওপর ‘দেয়াল’, ‘কপোতাক্ষে কচুরিপানা-শেওলার স্তূপে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হওয়ার শঙ্কা’ এবং ‘তেঁতুলিয়ায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা: পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি, বিশুদ্ধ পানির সংকট’ শিরোনামে পৃথক চারটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। সংবাদগুলো সারমর্ম দাঁড়ায়Ñ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষত সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজ ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, নদী ভরাট, বাঁধ ভাঙন এবং কৃষি বিপর্যয়ের মুখে। টানা বর্ষণ, নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার দৈন্য আজ এ অঞ্চলের জনজীবন ও কৃষিকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

সাতক্ষীরায় টানা বৃষ্টিতে রোপা আমনের চারার সংকট, বীজতলা বিনষ্ট, সবজি ক্ষেত ডুবে যাওয়া শুধুই কৃষি ক্ষতির পরিসংখ্যান নয়—এ একটি মানবিক বিপর্যয়। অন্তত ৩ হাজার হেক্টর জমি ডুবে গেছে, ৫০০ হেক্টর সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে, যা হাজারো কৃষকের মৌসুমি স্বপ্নকে বিলীন করে দিয়েছে। কৃষকদের হাহাকার শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও খাদ্য উৎপাদনেও এর প্রতিক্রিয়া পড়বে।

অন্যদিকে খুলনার কয়রায় নদীর পানি ঠেকাতে স্থানীয় জনগণ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধের ওপর ‘মাটির দেয়াল’ তৈরি করেছে। এটি যেমন এক অনন্য নাগরিক উদ্যোগের প্রতীক, তেমনি সরকারি দায়িত্বহীনতার একটি জ্বলন্ত দলিল। ষাটের দশকের জরাজীর্ণ বাঁধ দিয়ে আর চলবে না—এ কথা বারবার বলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অথচ নদী ভরাট, পলি জমা, জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মাথায় রেখে দ্রুত সময়ের মধ্যে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই।অন্যদিকে, কপোতাক্ষ নদের কচুরিপানা ও শেওলার স্তূপ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কেশবপুর, তালা, কলারোয়া ও মনিরামপুরের শতাধিক বিল প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি, রাস্তা ও সাঁকো ভেঙে গেছে। অথচ এই সমস্যার মূল উৎস নদীর প্রবাহে বাধা—যা নিয়মিত খনন ও পরিষ্কার না করায় ঘটেছে।তালার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নে জলাবদ্ধতার চিত্র আরো বেদনাদায়ক। পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিক্ষা ও কাজ বন্ধ—এ যেন এক নীরব দুর্যোগ। বছরের পর বছর এই সমস্যা চললেও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান আজও অনুপস্থিত।এই সংকটসমূহের সামগ্রিক বিশ্লেষণ করলে যে বাস্তবতা সামনে আসে তা হলোÑএটি নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের উদাসীনতার ফল। কৃষক, দিনমজুর, ভ্যানচালক, শিক্ষার্থীÑপ্রত্যেকেই আজ অসহায়, অথচ তাদের কথা অনেকে শুনতেই চায় না। কেবল প্রকল্প গ্রহণ নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তরিকতা ও জবাবদিহিতাও জরুরি।এমতাবস্থায় জনতার যে দাবিগুলো সামনে এসেছে সেগুলো হলোÑ সাতক্ষীরায় দ্রুত বৃষ্টির পানিনিষ্কাশনে জরুরি ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক। কয়রার বাঁধগুলো পুনর্র্নিমাণ ও আধুনিকায়নে জরুরি বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা হোক। কপোতাক্ষ নদসহ অন্যান্য নদ-নদীতে নিয়মিত খনন ও শেওলা অপসারণে একটি স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হোক। জলাবদ্ধ অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হোক। উপকূলীয় এলাকাকে ‘দুর্যোগপ্রবণ’ ঘোষণা করে আলাদা আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক।দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই দুর্দশা আজ সমগ্র দেশের জন্য সতর্ক সংকেত। এখনই যদি প্রশাসন এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলো সঠিক পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে শুধু কৃষি নয়Ñ জীবন ও জীবিকার এক বিপর্যয়কর ধস নেমে আসবে।সাতক্ষীরার বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলজুড়ে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভয়াবহ জলাবদ্ধতা জনজীবন ও কৃষিখাতকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন বিল ও নিচু এলাকাগুলো পানির নিচে চলে যাওয়ায় হাজার হাজার কৃষক এবং পানিবন্দি মানুষ গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

কৃষিখাতে ভয়াবহ ক্ষতি

এই জলাবদ্ধতায় প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ধান, ১৫০ হেক্টর বীজতলা এবং ৫০০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষেত সম্পূর্ণরূপে তলিয়ে গেছে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ডাইয়ের বিল, রামচন্দ্রপুর বিল, শাল্যের বিলসহ কমপক্ষে ২০টি বিল এবং বালুইগাছা, গোবিন্দপুর, বড়দলসহ ১০টিরও বেশি গ্রাম এখন জলমগ্ন। কৃষকদের চোখেমুখে এখন শুধুই হতাশার ছাপ।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, ১০ বিঘা জমির অর্ধেকটায় চারা রোপণ করেছিলাম, বাকিটা এখন পানির নিচে। বীজতলাও নষ্ট হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে চারা লাগানোর সুযোগও পাব না।

আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ২০ বিঘা জমির মধ্যে আট বিঘায় চারা দিয়েছিলাম। সব জমিই তিন-চার ফুট পানির নিচে। খালগুলো বন্ধ থাকায় পানি নামছে না, আমাদের সব শেষ হয়ে গেলো।

সবজি চাষিরাও এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাননি। কৃষক শফিকুর রহমান বলেন, চার বিঘায় ঢ্যাঁড়স, বরবটি, পটল, ওলসহ প্রায় তিন লাখ টাকার সবজি চাষ করেছিলাম। এখন সবকিছুই পানির নিচে। আবার নতুন করে শুরু করতে হবে, কিন্তু কোথা থেকে পুঁজি আসবে?

জনজীবন বিপর্যস্ত

কেবল কৃষিখাত নয়, জনজীবনও স্থবির হয়ে পড়েছে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য বলেন, বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর মধ্যবর্তী অন্তত ২০টি বিল ও ১০টি গ্রামের মানুষ এখন পানিবন্দি। গ্রামীণ রাস্তায় হাঁটু পানি, স্কুলে ক্লাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, আর স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। দুর্ভোগের কোনও সীমা নেই।

সাতক্ষীরা পৌর শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ।

ভ্যানচালক আসলাম শেখ বলেন, রাস্তায় পানি উঠলে ভ্যান চালানো যায় না। ঘরে বসে থাকলে পরিবার চলে না। টানা বৃষ্টিতে জীবনটাই থেমে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকা এবং খাল দখলের কারণে এমন দুর্ভোগ বারবার হচ্ছে।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, টানা বর্ষণে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ফসল ডুবে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক হিসাব করতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।

এদিকে, সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানিয়েছেন, আগামী ৪-৫ দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি সরকারি পদক্ষেপ ও ত্রাণ সহায়তা না এলে কৃষকদের চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় মানুষ।