থাকছে না ছয় ঋতু, ৫০ বছর পর উধাও হতে পারে শীত

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে শীত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীত ঋতুর ব্যাপ্তি ক্রমেই কমে আসছে। একসময় টানা দুই মাসের কনকনে শীত এখন নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েক দিনে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিশ্ব উষ্ণায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছর পর এ অঞ্চলের প্রকৃতি থেকে শীত ঋতু প্রায় উধাও হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীতকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় ৮০ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সঙ্গে শীতের মাসগুলোতে গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যেখানে ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে তা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান বলেন,
‘বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পড়ছে শীতের ওপর। ফলে শীতকালের সময়সীমা ছোট হয়ে আসছে।’

আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) জানিয়েছে, বিশ্ব উষ্ণায়নের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, দ্রুত হারে বরফ গলছে, সাগরের তাপমাত্রা বাড়ছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বিপজ্জনক গতিতে বাড়ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—তা বাস্তবে দৃশ্যমান। শীতের পাশাপাশি অন্যান্য ঋতুর বৈশিষ্ট্যও বদলে যাচ্ছে। একসময় পৌষ-মাঘে শীতের শুরু হলেও এখন ভরা মৌসুমেও শীতের দেখা মেলে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শীতকালীন ফসল উৎপাদনে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজসহ বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে শীতের মাসগুলোতে। আর ২০৭০–৭৫ সালের দিকে শীতকালে বৃষ্টিপাত প্রায় শূন্যে নেমে আসতে পারে। ফলে শীতকাল রূপ নেবে শুষ্ক ও খরা মৌসুমে।

‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’ শীর্ষক এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতাব্দীর শেষ নাগাদ দেশের গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে শীত মৌসুম প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে এক-দুদিন হালকা শৈত্যপ্রবাহ দেখা গেলেও দেশের বড় অংশে শীত আর অনুভূত হবে না।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও শীতকালে চরম শুষ্কতা দেখা দেবে। এতে বন্যা, খরা ও কৃষি সংকট আরও বাড়বে। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত মোকাবিলায় এখনই কার্যকর অভিযোজন ও দূষণ হ্রাসের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে দেশের প্রকৃতি, কৃষি ও জনজীবনে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ। শীতের বিদায় সেই পরিবর্তনেরই একটি স্পষ্ট বার্তা।