
নিজস্ব প্রতিবেদক | সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় পোল্ডারগুলোর নাজুক অবস্থা এবং অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ—সব মিলিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এখন এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই জনপদ বিরানভূমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনসংখ্যা কমছে উপকূলে সাধারণত বাংলাদেশে জনসংখ্যার হার ক্রমবর্ধমান। অথচ ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলায় জনসংখ্যা কমেছে। যেখানে জাতীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ, সেখানে বৃহত্তর খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে তা মাত্র শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে ১৯টি উপকূলীয় জেলাতেই মানুষ এলাকা ছাড়ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ২০৫০ সাল নাগাদ এ অঞ্চল থেকে আরও ১৩ লাখ মানুষ হারিয়ে যেতে পারে।
বাঁধ ও নদীর বেহাল দশা উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত অধিকাংশ পোল্ডার ৫০-৬০ বছরের পুরোনো। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং চিংড়ি চাষের জন্য যত্রতত্র বাঁধ কেটে লবণপানি ঢোকানোর ফলে এগুলো ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, এই জরাজীর্ণ বাঁধগুলো এখন অস্বাভাবিক জোয়ার বা ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
চিংড়ি চাষ ও পরিবেশ বিপর্যয় আশির দশকে চিংড়ি চাষ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোনা পানির আগ্রাসনে কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, মরে গেছে গাছপালা। চিংড়ি চাষে কর্মসংস্থান কম হওয়ায় এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকটে উপকূলের মানুষ এখন দিশেহারা। কয়রা, শ্যামনগর ও দাকোপের মতো এলাকাগুলো এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
সমাধানের পথ: সমন্বিত পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা উপকূলকে রক্ষায় কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন:
বাঁধ পুনর্নির্মাণ: জরাজীর্ণ বাঁধের ওপর মেরামত না করে নতুন ও সুদৃঢ় বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বাঁধের সামনে বনায়ন করলে তা জলোচ্ছ্বাসের প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে সহায়ক হবে।
নদী পুনঃখনন: পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া মৃতপ্রায় নদী ও খালগুলো পুনঃখনন করে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
গঙ্গা ব্যারাজ: গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ দাক্ষিণ্যাঞ্চলকে বাঁচানোর জন্য অন্যতম বিকল্প। এটি স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করে লবণাক্ততা কমাতে ভূমিকা রাখবে।
প্রকৃতিবান্ধব ভূমি ব্যবহার: লবণপানি ঢোকানো বন্ধ করে ধান, মাছ ও গবাদিপশুর মিশ্র চাষাবাদে ফিরে যেতে হবে।
ঝুঁকির শীর্ষে বাংলাদেশ গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যায় প্রতিবছর জিডিপির বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, গত ২০ বছরে বিশ্বের যে ১০টি দেশ সবচেয়ে বেশি দুর্যোগের শিকার হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ নবম।
উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ রক্ষায় শুধু কারিগরি সমাধানই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্থানীয় আর্থসামাজিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেকসই পরিকল্পনা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, সমন্বিত উদ্যোগের অভাব হলে অদূর ভবিষ্যতে এই উপকূলীয় অঞ্চল কেবল মানুষের বসবাসের জায়গা হারাবে না, বরং তা পরিণত হবে এক বিশাল বিরানভূমিতে।
