
সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব দিন দিন বাড়ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা—এসবের সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে দেশের উপকূলীয় মানুষের।
উপকূলের মানুষেরা বলছেন, তারা ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তা চান না; চান দুর্যোগের স্থায়ী সমাধান। বারবার ঘরবাড়ি ভাঙা, জমিতে লবণাক্ততা, জীবিকা হারানো আর পুনর্বাসনের অনিশ্চয়তা—এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে চান তারা।
জার্মান ওয়াচের বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্যানেল (আইপিসিসি) বলছে, ২১০০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশ সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন আইন, নীতি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। ২০১২ সালে প্রণীত হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন। গঠন করা হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল ও জরুরি সাড়াদান কাঠামো। রয়েছে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং ত্রাণ সহায়তার নানা কর্মসূচি।
তবু বাস্তবতায় দেখা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখনও অনেকাংশে ত্রাণনির্ভর। ঝুঁকি হ্রাস ও অভিযোজনভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন ও নীতিমালার অভাব নেই, অভাব রয়েছে কার্যকর বাস্তবায়নের।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে অনেক সময় ‘রোল মডেল’ বলা হলেও বাস্তবে ঝুঁকি হ্রাসের চেয়ে ত্রাণ বিতরণেই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে দুর্যোগের মূল কারণগুলো থেকে মুক্তি মিলছে না।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. আনজুম তাসনুভা বলেন, আশ্রয়কেন্দ্র বা বাঁধ নির্মাণই একমাত্র সমাধান নয়। দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং তথ্যভিত্তিক সমন্বয় সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু বাস্তবায়নে বড় ধরনের গ্যাপ রয়ে গেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর দুর্যোগে বাংলাদেশে প্রায় ৬৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গড়ে বছরে ক্ষতি হয় প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা না হলে এই ক্ষতি ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
দুর্যোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ফসল উৎপাদন কমছে। এতে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলায় ত্রাণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে ঝুঁকি হ্রাস ও অভিযোজনভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে টেকসই বাঁধ, নদীশাসন, জীবিকায় বৈচিত্র্য, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং পরিকল্পিত পুনর্বাসন ছাড়া উপকূল রক্ষা সম্ভব নয়।
উপকূলের মানুষের দাবি তাই স্পষ্ট—ভাত-কাপড়ের সাময়িক সহায়তা নয়, চাই দুর্যোগের স্থায়ী সমাধান। কার্যকর পরিকল্পনা, সুশাসন ও জনসম্পৃক্ততাই পারে উপকূলকে টেকসই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে।
