ইটভাটার ধোঁয়ায় পুড়ল বোরো ধান, ক্ষতিপূরণের দাবিতে কৃষকদের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি : ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় পুড়ে গেছে ক্ষেতের পাকা ধান। জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালি শিষ লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে বছরের একমাত্র ফসল নষ্ট হতে দেখে হতাশায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকেরা। ক্ষতিপূরণের দাবিতে তারা বিক্ষোভে নেমেছেন।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় পাঁচটি ইটভাটার ধোঁয়ায় ৫০০ থেকে ৬০০ একর জমির বোরো ধান পুড়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে দুই শতাধিক কৃষক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার বহুরিয়া ইউনিয়নের কোর্ট বহুরিয়া, বহুরিয়া চড়াপাড়া, বুধিরপাড়া, মন্দিরাপাড়া এবং ভাওড়া ইউনিয়নের সরিষাদাইড় ও ভাওড়া গ্রামে এক থেকে দেড় হাজার একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এসব ধান কাটার কথা ছিল। কিন্তু ধান পাকার সময়ই ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গতকাল দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, গোড়াই ও বহুরিয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ফসলি জমির মধ্যেই পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে এফবিসি, আরইউবি, সান, হাদি ও এনএসটি ব্রিকসের ইট পোড়ানোর মৌসুম শেষ হওয়ায় সপ্তাহখানেক আগে ভাটাগুলো বন্ধ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভাটার আগুন নেভানোর সময় নির্গত ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া আশপাশের ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েকশ একর জমির ধানগাছের পাতা লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে।

বুধিরপাড়া গ্রামের বিধবা কৃষক ফাহিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “৫০ শতাংশ জমিতে ধান করেছি। এই ধানেই সারা বছর চলে। এখন সব পুড়ে গেছে। বাচ্চাদের নিয়ে কী খাব?”

মন্দিরাপাড়া গ্রামের কৃষক নুরতাজ হোসেন স্বপন বলেন, “যে জমির ধানে সারা বছর খাই, সেই ধানই নষ্ট হয়ে গেল। এখন কীভাবে চলব?”—কথা বলতে বলতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা জানান, ইটভাটার ধোঁয়ায় তাদের ব্যাপক ক্ষতি হলেও এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তাই বাধ্য হয়ে তারা বিক্ষোভে নামেন।

অভিযোগের বিষয়ে এফবিসি ব্রিকসের মালিক আকবর হোসেন বলেন, তাঁদের ভাটার ধোঁয়া দুই সপ্তাহ আগে ছাড়া হয়েছে, আর কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে কয়েক দিনের মধ্যে। তবে অন্যান্য ভাটার ধোঁয়াও নির্গত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরইউবি ব্রিকসের মালিক ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “শুধু আমাদের ভাটা নয়, আরও কয়েকটি ভাটা বন্ধ হয়েছে। সেগুলোর ধোঁয়াও ছাড়ানো হয়েছে। আমরা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছি, সমাধানের চেষ্টা চলছে।”

হাদি ব্রিকসের মালিক স্বপন মিয়া বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা খাতুন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা পাওয়ার পর সরেজমিনে তদন্ত করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান সালমান হাবীব বিক্ষুব্ধ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দেন। তিনি কৃষি বিভাগকে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের নির্দেশ দেন।

কৃষকদের দাবি, দ্রুত ক্ষতির সঠিক হিসাব করে তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক এবং ভবিষ্যতে যেন ফসলি জমির পাশে ইটভাটা স্থাপন না করা হয়।