
সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা : বাংলাদেশ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। নদী, হাওর, বন, উপকূল, পাহাড় ও দ্বীপ—এই বৈচিত্র্য শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যের উৎস নয়, বরং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভর করেই দেশে পর্যটন শিল্প ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে দেশের পরিবেশ মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের অন্তত ১২টি অঞ্চলকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া—ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা, কক্সবাজার–টেকনাফ উপকূল, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর ও উপকূলের বিভিন্ন সংরক্ষিত অঞ্চল। এসব এলাকায় সামান্য পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতাও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দেশের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকাগুলোতে ছুটির মৌসুমে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়। কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন, কুয়াকাটা, টাঙ্গুয়ার হাওর ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল মিললেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্লাস্টিক বর্জ্য। পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, পলিথিন ব্যাগ, স্ট্র ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী পর্যটন এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বড় দূষণের উৎস হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটকরা ব্যবহার শেষে এসব বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে খোলা পরিবেশে ফেলে যাচ্ছেন। ফলে সেগুলো নদী, হাওর ও সমুদ্রে গিয়ে জমা হচ্ছে। জোয়ার–ভাটা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এসব প্লাস্টিক আরও বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের নদী ও সমুদ্রের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন কয়েক টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এসব প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাছ, শামুক, ঝিনুকসহ সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
সুন্দরবনের নদী–খালগুলোতেও প্লাস্টিক দূষণ বাড়ছে। পর্যটনবাহী নৌযান থেকে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য নদীর পানিকে দূষিত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের নদীতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা মাছ ও বন্য প্রাণীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন পর্যটনের চাপ ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর একটি। ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি পর্যটকের যাতায়াতে দ্বীপটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একইভাবে রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরেও পর্যটন ও নৌপরিবহনের কারণে প্লাস্টিক দূষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা জরুরি। ইসিএ এলাকাগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ, বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যটকদের আচরণগত পরিবর্তন ও পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দেশের পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকাগুলোর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। আর তার প্রভাব পড়বে জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য ও পর্যটন শিল্প—সবখানেই।
