
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : মিষ্টি পানির চরম সংকট আর মাটির ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, এই দুই প্রতিকূলতার সঙ্গে মিতালি করে বোরো ধান আবাদ করছেন সাতক্ষীরার কৃষকেরা। তবে এবার চাষিদের জন্য বড় বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে সার ও কীটনাশকের চড়া দাম। এমন পরিস্থিতিতে লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলের কৃষকদের আগাম আবাদ ও লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
ভৌগোলিক কারণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা সাতক্ষীরা জেলার একটি বড় অংশ বছরের অধিকাংশ সময় লবণাক্ততার ঝুঁকির মুখে থাকে। বিশেষ করে নদী-খাল আর চিংড়িঘেরের লোনা পানির প্রভাবে সাধারণ চাষাবাদ ব্যাহত হয়। তবুও জীবন-জীবিকার তাগিদে এই লবণাক্ত মাটির সঙ্গে লড়াই করেই বোরো আবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন উপকূলের কৃষকেরা।
কেন এই আগাম চাষ?স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সাধারণত মার্চ ও এপ্রিল মাসের শুষ্ক মৌসুমে এ অঞ্চলে লবণের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা ধান চাষের জন্য বড় বাধা। সেই ঝুঁকি এড়াতে এবার কৌশল বদলেছেন তারা। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার আগেই আবাদ শুরু করেছেন। তাদের লক্ষ্য, বর্ষায় জমে থাকা খালের মিষ্টি পানি ব্যবহার করে দ্রুত ফসল ঘরে তোলা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার গাভা গ্রামের কৃষক মোয়াজ্জেম হোসেন এবার আগাম বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগাম চাষের ফলে মার্চ-এপ্রিল আসার আগেই ধান পেকে যায়, যা লোনা পানির হাত থেকে ফসল রক্ষা করে। এ ছাড়া খালে জমে থাকা বৃষ্টির মিষ্টি পানি ব্যবহার করতে পারায় এবার সেচ খরচও কিছুটা কম হয়েছে।
উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তাআবাদ আগাম শুরু হলেও কৃষকদের চোখে-মুখে এখনও চিন্তার ছাপ। তাদের অভিযোগ, চড়া মূল্যের সার, কীটনাশক আর জ্বালানি তেলের কারণে এবার বিঘাপ্রতি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে উৎপাদিত ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় অঙ্কের লোকসানের শঙ্কায় আছেন তারা।
সাতক্ষীরা সদরের ফিংড়ি এলাকার কৃষক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ডিজেল আর সারের দাম বাড়ায় সেচ দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমরা ঝুঁকি নিয়ে চাষ করছি, কিন্তু বাজারে ধানের সঠিক দাম না পেলে বড় লোকসানে পড়তে হবে।’
একই এলাকার কৃষক নিমাই মন্ডল জানান, শুধু সার-কীটনাশক নয়, দিনমজুরের মজুরিও বেড়েছে। সব মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে ধান ফলাতে যা খরচ হচ্ছে, তাতে লাভ করাটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আশাশুনি উপজেলার ব্যাংদহ এলাকার কৃষক হরিপদ গাইন বলেন, ‘উপকূলের লোনা মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের টিকে থাকতে হয়। যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয় বা ধানের দাম কম থাকে, তবে আগামীতে বোরো চাষাবাদ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সম্ভাবনাপ্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আশার কথা শোনাচ্ছে জেলা কৃষি বিভাগ। তাদের পরামর্শে কৃষকেরা এখন শুধু চিরাচরিত চাষাবাদ নয় বরং ব্যবহার করছেন উন্নত প্রযুক্তির লবণসহিষ্ণু বীজ।উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় লবণাক্ততার কারণে অনেক জমিতে ভালো ফসল হতো না। তবে এসব জমিতে এখন উচ্চফলনশীল জাতের বোরো ধান আবাদ হচ্ছে। আবাদের বিস্তারও বাড়ছে প্রতি বছর। চলতি মৌসুমে জেলায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে লবণসহিষ্ণু বিভিন্ন জাতের বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় চার হাজার হেক্টর বেশি।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় ১ লাখ ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে লবণসহিষ্ণু জাতের ধান। গত মৌসুমে এর পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার হেক্টর।
আশাশুনি উপজেলার মাদারবাড়িয়া গ্রামের বোরো চাষী খোকন গাইন জানান, তার এলাকার অধিকাংশ জমিতে উচ্চমাত্রার লবণ থাকায় সব জাতের ধান চাষ করা যায় না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে কয়েক বছর ধরে লবণসহিষ্ণু জাতের বোরো ধান চাষ করছেন তিনি। চলতি মৌসুমে ১৫ বিঘা জমিতে লবণসহিষ্ণু ব্রি-৬৭ জাতের ধান চাষ করেছেন তিনি। গত বছর একই পরিমাণ জমিতে এ জাতের ধান চাষ করে ২৭ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছেন। তার গ্রামের অনেকেই এখন লবণসহিষ্ণু ব্রি-ধান চাষ করছেন বলেও জানান এ কৃষক।
একই উপজেলার বিছট গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন জানান, তার গ্রামের সব জমিতেও মাত্রাতিরিক্ত লবণ। পাঁচ বছর আগেও এসব জমিতে বোরো চাষে ভালো ফলন হতো না। কেউ কেউ চাষ করলেও বিঘায় বড়জোর ১২ মণ ধান পাওয়া যেত, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অর্ধেক। চার বছর ধরে এ এলাকার কৃষকরা লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ করছেন। রুহুল আমিন জানান, এ এলাকার অধিকাংশ কৃষক চিংড়ি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এখন লবণ পানির চিংড়ির ঘেরেই হচ্ছে বোরো ধান। অর্থাৎ একই ঘেরে মাছ উৎপাদন করে আবার ধানও চাষ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘উপকূলীয় সাতক্ষীরায় দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে চলেছে। এ পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে ১৪টি লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ব্রি ধান-৯৭, ৯৯, ৬৭ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া উচ্চ ফলনশীল ১১৭, ১১৩ এবং ব্রি-৯ জাতের ধানের গবেষণাও প্রায় শেষের দিকে। এ জাতের ধান বীজ শিগগিরই বাজারে আসবে। এসব জাত ১২-১৪ ডিএস পর্যন্ত লবণ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে, প্রতি বিঘায় ২৬-২৭ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।’
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকাগুলোতে প্রতি বছরই লবণসহিষ্ণু জাতের বোরা ধান উৎপাদন বাড়ছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে সাত উপজেলায় ১ লাখ ৮০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। যার ২৫ শতাংশই লবণসহিষ্ণু। গত মৌসুমে জেলায় ৭৯ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়। এর মধ্যে ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে লবণসহিঞ্চু জাতের বোরো ধান চাষ করা হয়। তবে এ মৌসুমে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে এ জাতের বোরো চাষ হয়েছে। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে ব্রি-৬৭, বিনা-১০ ব্রি-৯৭ ও ৯৯, যা ১২-১৩ ডিএস মাত্রার লবণ সহ্য করতে পারে।’
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (কৃষিবিদ) সাইফুল ইসলাম আরো বলেন, ‘লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষার জন্য আমরা কৃষকদের আগাম চাষে উৎসাহিত করছি। বিশেষ করে লবণাক্ত এলাকায় ব্রি ধান ৬৭, ৯৭, ৯৯ ও বিনাধান-১০ জাতের ধান চাষ করলে কৃষকেরা ভালো ফলন পাবেন। এ ছাড়া কিছু এলাকায় উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধান চাষ করারও পরামর্শ দিচ্ছি আমরা।’
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় ১ লাখ ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
