
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : পৃথিবীজুড়ে গত পাঁচ দশকে পাখির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, ১৯৭০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্ব থেকে প্রায় ৩০০ কোটি পাখি বিলুপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি তিনটি পাখির মধ্যে একটি হারিয়ে গেছে।
‘সায়েন্স অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল কনজারভেশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটছে। বিশেষ করে বনভূমি ধ্বংস, নগরায়ন, কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি পাখি কমেছে উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০ সালের পর থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ পাখি কমে গেছে। অনেক সাধারণ প্রজাতির পাখিও এখন বিলুপ্তির পথে।
গবেষণার প্রধান ড. কেন রসেনবার্গ বলেন,
“আমরা প্রথমবার এত বড় পরিসরে পাখির সংখ্যা বিশ্লেষণ করেছি। আশ্চর্যের বিষয় হলো—যে পাখিগুলো মানুষের আশপাশে সহজেই দেখা যেত, সেগুলোও দ্রুত কমে যাচ্ছে।”
গবেষকরা বলছেন, পাখি হ্রাসের মূল কারণ মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে—
বন উজাড় ও নগর সম্প্রসারণ
কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
কাঁচের ভবন ও যানবাহনের ধাক্কায় মৃত্যু
বিড়ালসহ শিকারি প্রাণীর আক্রমণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পাখিরা নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে পারছে না।
এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় পাখি ব্যবসা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সুরেলা কণ্ঠের পাখি ধরে খাঁচায় রাখা হয় এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিক্রি করা হয়।
জাভা দ্বীপে করা এক জরিপে দেখা গেছে, সেখানে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ পাখি খাঁচায় বন্দী রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, সেখানে এখন বনের পাখির চেয়ে খাঁচার পাখির সংখ্যা বেশি।
বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ফরিদপুর, খুলনা ও উপকূলীয় অঞ্চলে পাখির সংখ্যা দ্রুত কমছে।
কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পাখির খাদ্য পোকামাকড়ও কমে যাচ্ছে। এর ফলে ঘুঘু, বাবুই, টুনটুনি, কোকিল, শালিক, মাছরাঙা, ডাহুকসহ বহু পরিচিত পাখি এখন আগের মতো দেখা যায় না।
ফরিদপুরের প্রবীণ কৃষক আয়নাল মৃধা বলেন, “আগে জমিতে পাখির ডাক ছাড়া দিন শুরু হতো না। এখন আর সেই শব্দ শোনা যায় না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাখির বংশবৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। গরম বাড়ার কারণে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প বেড়ে বজ্রঝড় ও পরিবেশগত অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, যা পাখিদের জন্য হুমকি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিবেশ বিজ্ঞানী বলেন, “এক ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়লে পাখির সংখ্যা প্রায় ১০–১২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।”
পরিবেশবিদরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বহু প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। করণীয় হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন—
পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ
কীটনাশকের ব্যবহার কমানো
পাখির অভয়ারণ্য তৈরি
অবৈধ শিকার ও বাণিজ্য বন্ধ
জনসচেতনতা বৃদ্ধি
গবেষকদের মতে, এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান কেবল সতর্কবার্তা নয়, বরং একটি পরিবেশগত সংকটের ঘোষণা। তারা বলছেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল বইয়ের পাতায় পাখির গল্প পড়বে—আকাশে নয়।
