
সিরাজুল ইসলাম : মাঠের খেলাধুলা, বৃষ্টিভেজা দৌড়ঝাঁপ, ঘুড়ি ওড়ানো কিংবা দাদু-নানির গল্প—এসব নিয়েই একসময় গড়ে উঠত শিশুর শৈশব। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আজকের শিশুরা ক্রমেই প্রকৃতি ও শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এতে শুধু আনন্দই নয়, ঝুঁকিতে পড়ছে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।
আমরা হয়তো ভুলেই যাচ্ছি—শৈশব মানেই দুরন্তপনা। স্মৃতি আর স্বপ্নে মোড়ানো, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক নির্মল সময়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের শৈশব যেন চার দেয়ালের ভেতর বন্দি। ইট-কংক্রিটের ফ্ল্যাটে বড় হচ্ছে শিশুরা, কিন্তু পাচ্ছে না রোদ, বাতাস, মাঠ কিংবা খোলা আকাশের স্বাদ।
টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জীবনের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। অনেক শিশুই ঠিকভাবে বাংলা শেখার আগেই ভিনদেশি ভাষার শব্দ শিখছে কার্টুন ও চ্যানেলের প্রভাবে। এতে অভিভাবকেরাও উদ্বিগ্ন।
ভারতের অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ বাবা-মা টিভি অনুষ্ঠানে সহিংসতা ও অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ চান। জরিপে আরও উঠে এসেছে—চার থেকে আট বছর বয়সী শিশুদের আচরণগত সমস্যার পেছনে টেলিভিশনের বড় প্রভাব রয়েছে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দাদা-দাদি ও নানা-নানির সাহচর্য শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। অথচ এখন শহুরে জীবনে সেই যৌথ পারিবারিক সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত।
শহরের শিশুরা নদী দেখে না, সাঁতার শেখে না। ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো কিংবা মাঠে দৌড়ঝাঁপ তাদের কাছে রূপকথার গল্প। স্কুলের হোমওয়ার্ক, কোচিং, প্রতিযোগিতার চাপ—সব মিলিয়ে শৈশব কাটছে অস্থিরতায়।
মনোবিজ্ঞানী ডা. মেহতাব খানম বলেন,
“আজকের পরিবারগুলোতে শ্রদ্ধা, সহিষ্ণুতা ও নিঃশর্ত ভালোবাসার চর্চা কমে গেছে। শিশুর মানসিক চাহিদা না বুঝেই তাদের ওপর বাবা-মায়ের স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
দিনাজপুরের এক গ্রামে বড় হওয়া রুবেল বর্তমানে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শৈশবের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন,
“বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলতাম, পুকুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গোসল করতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা এসব জানেই না। ভাবলেই চোখে পানি আসে।”
একই অনুভূতি টাঙ্গাইলের সোহাইবেরও। তাঁর ভাষায়,
“আমরা পলিথিনে বই ভরে বৃষ্টিতে ভিজে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতাম। তারপর আবার খেলতে বের হতাম। এখনকার শিশুদের শৈশব পুরো আলাদা।”
শুধু জীবনধারাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনও কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের প্রকৃতির আনন্দ। আগে বৃষ্টিতে ভিজে খেলা ছিল স্বাভাবিক; এখন সামান্য বৃষ্টিতেই অসুস্থতার আশঙ্কা। বজ্রপাতের ভয়, দূষিত বৃষ্টি ও তাপদাহ শিশুদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে।
ইউনিসেফের ‘চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স’-এ ১৬৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম—অর্থাৎ শিশুদের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় দুই কোটি শিশু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও তাপদাহ শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, “গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারী ও শিশুরা।”
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান,
“লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো শিশুদের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। এতে শিশুর মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।”
একসময় সাতক্ষীরা, খুলনা, ভোলা কিংবা নোয়াখালীর আকাশ ভরে থাকত রঙিন ঘুড়িতে। ধান কাটার পর মাঠজুড়ে চলত ঘুড়ির লড়াই। আজ সেই দৃশ্য শুধুই স্মৃতি।
শ্যামনগরের প্রবীণ শুকুর আলী সরদার বলেন, “সাপ ঘুড়ি, তেলেঙ্গা ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে উড়াতাম। এখন আর কেউ ঘুড়ি বানাতেই জানে না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুড়ি ওড়ানো শুধু খেলা নয়—এটি শিশুদের সৃজনশীলতা ও মনোযোগ বাড়াত।
