সুন্দরবন ধ্বংসে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। হুমকির মুখে পড়েছে এই বনের জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও লাখো মানুষের জীবিকা। পরিবেশবিদেরা বলছেন, সুন্দরবন ধ্বংসের পেছনে আন্তর্জাতিক স্বার্থের প্রভাব যেমন আছে, তেমনি রয়েছে দেশের ভেতরকার দখল–দূষণ, শিল্পকারখানা নির্মাণ, নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, বন ধ্বংস ও জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব।

উন্নয়ন প্রকল্পে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি

সরকার একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক। কিন্তু পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্পের সুফল মিলছে কম, ক্ষতিই হচ্ছে বেশি। বনের বনভূমি, নদী-খাল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নই হয়ে উঠছে বনের জন্য নতুন হুমকি।

প্রাকৃতিক প্রাচীর সুন্দরবন আজ নিজেই বিপন্ন

ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, ফণী, আম্ফান, বুলবুল—প্রতিটি দুর্যোগে সুন্দরবন বুক পেতে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে। কিন্তু বছরের পর বছর মানবসৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি, বনভূমি দখল, কাঠ পাচার, বন্যপ্রাণী শিকার, খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা, পানি ও মাটির দূষণ, লবণাক্ততার বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সুন্দরবন আজ অস্তিত্ব সংকটে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়া ও উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় পূর্ণিমা–অমাবস্যায় বনাঞ্চলের উঁচু অঞ্চলও তলিয়ে যাচ্ছে। পানিতে ডিম নষ্ট হয়ে বন্যপ্রাণীর বংশবিস্তারে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটছে।

এক শতকে সুন্দরবনের আয়তন কমেছে ৪৫১ বর্গকিলোমিটার

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯০৪–১৯২৪ সালে সুন্দরবনের আয়তন ছিল ১১ হাজার ৯০৪ বর্গকিলোমিটার। ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৫০৬ বর্গকিলোমিটারে। গত ১০০ বছরে তাই আয়তন কমেছে ৪৫১ বর্গকিলোমিটার। কমেছে পানিধার, কাঁকড়া বিচরণক্ষেত্র, গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর সংখ্যা।

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের একের পর এক প্রমাণ

একসময় সুন্দরবনে ছিল ৪০০ প্রজাতির পাখি, এখন আছে ২৭০ প্রজাতি

বিলুপ্ত হয়েছে ১৩০ প্রজাতির পাখি

কমছে সুন্দরীসহ কম লবণসহিষ্ণু গাছ

বাড়ছে নদীর লবণাক্ততা

জাহাজের প্রপেলারের আঘাতে মারা যাচ্ছে ডলফিন

মাইক্রোপ্লাস্টিকে আক্রান্ত ১৭ প্রজাতির মাছ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি

বিশ্বব্যাংক ও আইইউসিএন সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনে ৫২৮ প্রজাতির বৃক্ষ ও লতা-গুল্ম, ৩০০ প্রজাতির পাখি, ৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণী ও ২৫০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। এই অনন্য সম্পদ এখনই ঝুঁকির মুখে।

নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনে বন আরও বিপন্ন

গত ছয়–সাত বছরে সুন্দরবনে বিলাসবহুল ২৯টি নৌযান যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুইমিংপুল, এসি, তিন তারকা মানের সুবিধা। পর্যটন নীতিমালা মানা হচ্ছে না। প্রতিদিন ৩০টির বেশি নৌযান সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে ঢোকে। উচ্চ শব্দ, শক্তিশালী লাইট, বর্জ্য—সব মিলিয়ে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, “নৌযানের ইঞ্জিনের শব্দ ও হাইড্রোলিক হর্ন বন্যপ্রাণীর ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। নিয়ম না মানায় ডলফিন মারা পড়ছে, বনের পানি–মাটি দূষিত হচ্ছে।”

শিল্পকারখানার চাপ ও ইসিএ লঙ্ঘন

সরকার সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ECA) ঘোষণা করলেও গত এক দশকে সেখানে গড়ে উঠেছে অন্তত ৬০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সিমেন্ট কারখানা, এলপি গ্যাস প্লান্ট, তেল শোধনাগারসহ নানা স্থাপনা। এসব শিল্পের বর্জ্য সুন্দরবনের পানি–মাটি দূষিত করছে।

পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সুতপা বেদজ্ঞ বলেন, “বিষ দিয়ে মাছ শিকারকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। খুলনায় পরিবেশ আদালত প্রয়োজন। জাতীয়ভাবে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণাও জরুরি।”

জাহাজ চলাচল ও দূষণের বাড়তি চাপ

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পশুর নদসহ প্রধান নদীগুলো দিয়ে প্রতিদিন ৩৪৫টি দেশি–বিদেশি জাহাজ চলাচল করে। গত ১০ বছরে এসব নদীতে অন্তত ২৬টি জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে। কয়লা, সার, ফার্নেস অয়েল—সবই ছড়িয়ে পড়েছে নদীতে, যার প্রভাব পড়ছে পুরো ইকোসিস্টেমে।

বন কর্মকর্তা এজেডএম হাসানুর রহমান বলেন, “স্মার্ট প্যাট্রোলিং চালু হয়েছে। র‍্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড যৌথভাবে কাজ করছে।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—এখনই ব্যবস্থা না নিলে বন আর টিকবে না

বিশেষজ্ঞদের মতে

সুন্দরবনের ভেতরে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন বন্ধ করতে হবে

শিল্পকারখানা ও দূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে

গোলপাতা ও ম্যানগ্রোভ গাছ লাগিয়ে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে

বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান জরুরি

বন্যপ্রাণী শিকার ও কাঠ পাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।