
শুঁটকি অর্থনীতির কেন্দ্র হলেও দাদন ও সিন্ডিকেটে বন্দি প্রায় ২০ হাজার জেলে
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা দুবলার চর—বাংলাদেশের বৃহত্তম শুঁটকি পল্লিগুলোর একটি। বছরের বেশির ভাগ সময় জনশূন্য থাকলেও শীত মৌসুম এলেই এখানে জেগে ওঠে এক বিশাল জেলে জনপদ। জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো জেলে-শ্রমিক এখানে গড়ে তোলেন অস্থায়ী বসতি।
কিন্তু এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কঠিন বাস্তবতা—দাদন, সিন্ডিকেট ও নানা বঞ্চনার বেড়াজালে আটকে আছে জেলেদের জীবন।
দুবলার চর মূলত কয়েকটি ছোট ছোট চর নিয়ে গঠিত। বর্ষা শেষে ইলিশ মৌসুম পেরিয়ে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস এখানে চলে মাছ ধরা ও শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞ। এ সময় প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার জেলে ও শ্রমিকের পদচারণায় মুখর থাকে পুরো এলাকা।
অন্যদিকে বছরের বাকি সময় চরটি প্রায় জনমানবশূন্য থাকে।
খুলনার বটিয়াঘাটার জেলে সজিব দাস জানান, পরিবার ছেড়ে মাসের পর মাস থাকতে হয় এখানে। “সংসার চালাতে হলে তো আসতেই হবে। সমুদ্র আর বনই আমাদের ভরসা,” বলেন তিনি।
রাতভর সাগরে মাছ ধরা, দিনে তা রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি—এভাবেই চলে তাদের দিনরাতের সংগ্রাম।
দুবলার চরের জেলেদের বড় সংকট দাদন বা অগ্রিম ঋণব্যবস্থা। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কিছু ‘সাহেব’ নামে পরিচিত মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মৌসুম শুরু করেন জেলেরা।
জেলে নজরুল ফকিরের অভিযোগ, “এক লাখ টাকা নিলে পাঁচ লাখ টাকার মাছ দিতে হয়। বাইরে মাছ বিক্রি করার সুযোগ নেই।”
অন্য জেলে সেলিম মাঝি বলেন, “সবকিছুই ঠিক করেন এই সাহেবরা—কত দামে মাছ বিক্রি হবে, কার কাছে বিক্রি হবে।”
প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস হলেও দুবলার চরে নেই স্থায়ী হাসপাতাল বা নিরাপদ পানির ব্যবস্থা।
জেলে নাহিদুল ইসলাম মৃধা বলেন, “কুয়ার পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। চিকিৎসার জন্য ১০–১২ ঘণ্টা নৌপথে যেতে হয়।”
সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে বিষধর সাপের কামড়ের ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানান অন্য জেলেরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সুন্দরবন এখন অনেকটাই জলদস্যুমুক্ত। এতে জেলেদের নিরাপত্তা বেড়েছে। তবে দাদন ও সিন্ডিকেটের কারণে অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি তাদের জীবনে।
দুবলার চরকে দেশের শুঁটকি অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র বলা হয়। এখানে অন্তত ২৫–১০০ প্রজাতির মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি হয়।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমে কয়েকশ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন ও বেচাকেনা হয়। সরকারও প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে।
এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১০–১২ লাখ মানুষের জীবিকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থা এবং দাদনমুক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে শুঁটকি শিল্প আরও বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে।
তবে জেলেদের দাবি, “প্রথমে আমাদের বাঁচতে দিন—ন্যায্য দাম, নিরাপত্তা আর চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক।”
