
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : ‘আগে সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলতো। এখন সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ। কোনো কাজ নেই, সংসার চালানোর অর্থও নেই। তিন বেলা খাবার জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়। তরিতরকারি ও মাছ কিনবো কীভাবে? আর মাংস কেনা এবং খাওয়া তো আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো।’
দৈনন্দিন জীবনের নানা সংকট ও দূরবস্থার এই কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া এলাকার বনজীবী লিয়াকত আলী। শুধু লিয়াকত নন, জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত উপকূলের জেলে, বাওয়াল, মৌয়াল ও গোলপাতা সংগ্রহকারী সব শ্রমজীবী মানুষের পরিবারের চিত্র এখন একই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির বাজারে সীমিত আয়ের এই মানুষগুলো সংসার চালাতে এখন একপ্রকার যুদ্ধ করছেন। ফলে এই অঞ্চলের পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র পুষ্টি ঘাটতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর সাতক্ষীরা জেলা ও কমিউনিটি রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই অঞ্চলের চরম অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার এক ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। শুমারি অনুযায়ী, শ্যামনগর উপজেলার মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ এখনও চরম দারিদ্র্য নির্দেশক সূচকের নিচে বাস করছে।
বিশেষ করে দুর্যোগপ্রবণ গাবুরা ইউনিয়নে ১৫ হাজার ১৫৫টি পরিবারের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২৯০টি পরিবার পাকা বা আধা-পাকা ঘরে থাকার সামর্থ্য রাখেন। বাকি প্রায় ৯১.৪৮ শতাংশ পরিবারই বাস করছে ভাঙাচোরা কাঁচা ঘর ও ঝুপড়িতে। চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা বাসস্থানহীন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে নিয়মিত বাজার থেকে মাছ ও মাংস কিনে খাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।দুর্যোগের পিঠে দুর্যোগ, কোরবানি কমেছে ৩০%
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় আইলা, আম্পান, ইয়াস, ফণী, বুলবুল কিংবা সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রিমাল ও নদীভাঙনের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলের মধ্যবিত্তরাও এখন নিঃস্ব হয়ে নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে সামর্থ্যবানদের কোরবানি দেওয়ার হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
গাবুরার ডুমুরিয়া এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঈদের দিন এলাকার বিভিন্ন মসজিদে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এবার কোরবানিদাতা অনেক কমে গেছে। এজন্য আমার মতো দুস্থ পরিবারগুলোর ভাগ্যে মাত্র ২৩০ গ্রাম করে মাংস জুটেছে। গত কোরবানির পর এবার ঈদে মাংস চোখে দেখলাম। বছর ঘুরে আসা ঈদের দিনের এই মাংসটুকুই খেয়েছি। আবার এক বছর অপেক্ষায় থাকতে হবে।’
বাঘের থাবায় স্বামীহারা আমেনার দীর্ঘশ্বাস
সংসারের এমন দূরবস্থার কথা জানাতে গিয়ে চোখ মোছেন গাবুরার ডুমুরিয়া এলাকার আমেনা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান ২২ বছর আগে। ছেলেমেয়েকে নিয়ে অনেক দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। এখনও ভাতার কার্ড কিংবা সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি। নদীতে মাছ ধরে, মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি।’
আমেনা আরও বলেন, ‘বছরের বারো মাস সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়, মাছ-মাংস কিনবো কীভাবে? শরীরও এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, বেশি কাজ করতে গেলে মাথা ঘোরে।’
পরিসংখ্যান ব্যুরোর টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) সূচক অনুযায়ী, শ্যামনগর ও গাবুরা অঞ্চলের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবসমাজের এক বিরাট অংশ (বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি) কোনো প্রকার শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কারিগরি প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই। ঘরে ঘরে কর্মক্ষম মানুষের এই বেকারত্বই উপকূলের পরিবারগুলোকে পুষ্টিকর খাদ্য কেনা থেকে বঞ্চিত রাখছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মা ও শিশু, বাড়ছে রক্তস্বল্পতা
উপকূলীয় অঞ্চলের এই পুষ্টিহীনতা ও শারীরিক জটিলতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকেরা।
সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফরহাদ জামিন বলেন: “শরীরে আয়রনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উৎস হলো লাল মাংস (গরু বা খাসি)। দীর্ঘদিন যারা লাল মাংস খেতে পারছে না, তারা নিশ্চিতভাবেই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শরীরে, দেখা দিচ্ছে ‘আয়রন ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া’ বা তীব্র রক্তস্বল্পতা।”
তিনি আরও জানান, নারীদের প্রতি মাসের শারীরিক চক্রের কারণে আয়রনের যে ঘাটতি হয়, তা শুধু সরকারি ট্যাবলেটে পূরণ সম্ভব নয়। মা অপুষ্টিতে ভুগলে তার প্রভাব সরাসরি অনাগত শিশুর ওপর পড়ে। ফলে নবজাতকের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয় এবং শিশুকে বাঁচাতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে আইসিইউর বিশাল আর্থিক বোঝা টানতে হয়।
গাবুরার ডুমুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) হেলেনা বিলকিস জানান, এই অঞ্চলে প্রতি ১০ জন মায়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই (৫০ শতাংশ) মাঝারি ধরনের অপুষ্টিতে ভুগছেন। আর প্রতি ৫০ জনে গড়ে একজন মারাত্মক তীব্র অপুষ্টির শিকার। তীব্র লবণাক্ততার কারণে এলাকায় বর্ষাকাল ছাড়া শাকসবজি বা ফলমূল সচরাচর জন্মায় না। ফলে চড়া দামে বাইরে থেকে পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যও এদের নেই। এর ওপর যোগ হয়েছে বাল্যবিবাহের উচ্চ হার।
তবে উপকূলের মানুষের পুষ্টির এই ঘাটতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোণ থেকে দেখছেন শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমিষ বা প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য কেবল গরুর মাংসই লাগবে এমন কোনো কথা নেই। এই অঞ্চলে নদী ও ঘেরের কারণে মাছের প্রাধান্য রয়েছে। এছাড়া ঘরে ঘরে হাঁস-মুরগি পালন করা হচ্ছে। ফলে নিয়মিত গরুর মাংস কিনতে না পারলেও ডিম বা মুরগির মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ তাদের পুষ্টির ঘাটতি অনেকটাই মিটিয়ে নিতে পারে।’
অন্যদিকে সাউদার্ন চ্যারিটি যুব ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন মনে করেন, খাদ্যাভ্যাসের সীমাবদ্ধতাও পুষ্টিহীনতার অন্যতম কারণ। এখানকার মানুষ শর্করার জন্য কেবল চালের ওপর নির্ভরশীল, আটা বা রুটি খাওয়ার অভ্যাস তাদের নেই। ফলে পুষ্টির একটি বড় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। ইটভাটার মৌসুমে কিছু শ্রমিক দাদন নিয়ে মাংস কিনতে পারলেও, বিধবা ও দুস্থ নারীরা চরম খাদ্য সংকটে থাকেন।
প্রয়োজন সরকারি ‘পুষ্টি কার্ড’ এই স্থায়ী সংকট নিরসনে বিশেষ সরকারি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকা দুর্যোগপ্রবণ এবং তীব্র লবণাক্ত। এখানকার মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। ইউনিয়নের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ মানুষের কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য আছে। সরকার যদি পুষ্টি কার্ড বা দুস্থদের জন্য বিশেষ পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করতো, তবেই এ অঞ্চলের মানুষের পুষ্টি ঘাটতি দূর করা সম্ভব।’
