ঘূর্ণিঝড় আসে, ঘূর্ণিঝড় যায়; থেকে যায় উপকূলের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : ঘূর্ণিঝড় রিমাল আঘাত হানার দুদিন পর সাতক্ষীরার উপকূলে মৃত বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ছিল ৫৪। একদিনের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬–এ। কিন্তু এই সংখ্যাও কি প্রকৃত ক্ষতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে? স্থানীয়দের ভাষায়—দুর্যোগ শেষ হলেও ক্ষত থেকে যায় বছরের পর বছর।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, রিমালের প্রভাবে দেশের ৪৮ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর ফসলি জমি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে সময় লাগবে অন্তত এক সপ্তাহের বেশি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক নয়—এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় জীবিকা, কৃষি, পানি ও সামাজিক কাঠামোকে বিপর্যস্ত করে।

সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও বরগুনার উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় মানেই নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকে পড়ে গ্রামে, নষ্ট হয় ফসলি জমি, পানির উৎস হয়ে পড়ে অনিরাপদ।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর কয়রার উত্তর বেদকাশীর একটি আশ্রয়কেন্দ্রে দেখা গিয়েছিল বাঁধের ওপর আশ্রিত মানুষদের নতুন করে জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা। কিন্তু অনেক পরিবারই আর নিজ গ্রামে ফিরতে পারেনি।

স্থানীয় এক বাসিন্দার ভাষায়, “ঘূর্ণিঝড় গেলে খবরও চলে যায়। কিন্তু আমাদের জীবন থেকে যায় বাঁধের ওপরই।”

ঘূর্ণিঝড়ের পর সবচেয়ে কম আলোচিত ক্ষতির একটি হলো সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা ব্যাহত হওয়া, বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং জীবিকার চাপে শহরমুখী অভিবাসন বাড়ে।

একই সঙ্গে দুর্যোগের পর দুর্বল পরিবারগুলো মানব পাচারের ঝুঁকিতেও পড়ে—এমন আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে।

উপকূলের সবচেয়ে বড় সংকট সুপেয় পানির অভাব। ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে পুকুর ও জলাধারে লোনা পানি ঢুকে গেলে সেই পানি আর সহজে ব্যবহারযোগ্য থাকে না।

কয়রার ঢাংমারী এলাকার বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক ঝড়ে মিঠাপানির সব উৎস নষ্ট হয়ে গেছে। এখন খাবার পানির জন্যও নির্ভর করতে হচ্ছে দূরবর্তী উৎসের ওপর।

দুর্যোগের পর সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ—অনেক ক্ষেত্রেই তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান দিতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্বল বেড়িবাঁধ, পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টারের অভাব এবং মাঠপর্যায়ের দুর্বল সমন্বয় উপকূলকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

ফকিরকোনা বা সুতারখালী মতো প্রত্যন্ত এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে ঘূর্ণিঝড়ের পরও প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার পানিতে গ্রাম প্লাবিত হয়। ঘরবাড়ি নষ্ট হলেও মানুষ বাধ্য হয়ে একই জায়গায় টিকে থাকার চেষ্টা করে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষায়, “আমরা ঘূর্ণিঝড়ের সাথে না, প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বাঁচি।”

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপকূল রক্ষায় সবচেয়ে জরুরি হলো টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা কার্যকর করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা।

একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা ও নীতিগত উদ্যোগ বাড়ানোর কথাও বলছেন তারা।

ঘূর্ণিঝড় আসে, ঘূর্ণিঝড় যায়। কিন্তু উপকূলের মানুষের জীবনে থেকে যায় লোনা পানির দাগ, ভাঙা ঘর, আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এই ক্ষতগুলো কোনো পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না—থেকে যায় বাস্তব জীবনের প্রতিদিনের সংগ্রামে।