
সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা প্রতিনিধি :খুলনার দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ইউনিয়নের আনিস মোল্লা (৩৫) এখনো ভুলতে পারেননি ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর আর ২০০৯ সালের আইলার কথা। দুটি প্রলয়ংকরী ঝড়ে সর্বস্ব হারিয়ে তিনি টানা সাত বছর পরিবার নিয়ে বাঁধের ওপর মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। অভাবের কারণে দুই সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। একমাত্র মেয়েকে অল্প বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এমন গল্প আজ আর ব্যতিক্রম নয়—বাংলাদেশের উপকূলজুড়ে এটি যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এখন স্পষ্ট। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকট—এই চতুর্মুখী বিপদের মুখে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলের মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও নারীরা। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের উপকূলীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতেও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ঝুঁকির মধ্যে থাকা প্রায় দুই কোটি শিশুর মধ্যে নদীভাঙন এলাকায় বাস করছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিশু। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে ৪৫ লাখ শিশু এবং খরার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ শিশু। বারবার দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হয়ে এসব পরিবারের অনেক শিশু পড়াশোনা ছেড়ে শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। কোথাও বাল্যবিবাহ, কোথাও শিশুশ্রম—দুইয়ের ফাঁদেই আটকা পড়ছে উপকূলের শিশুরা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে, বিশ্বে শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। বেসরকারি তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুর সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলাসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সাতক্ষীরা ও খুলনার কিছু এলাকায় পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ১০ পিপিটি পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে শিশুরা বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি পান করছে এবং নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলবর্তী প্রায় ৫৩ শতাংশ অঞ্চল লবণাক্ততায় আক্রান্ত। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, জীবিকা হারাচ্ছে হাজারো পরিবার। দারিদ্র্যের চাপে অনেকে শহরমুখী হচ্ছে, যেখানে শিশুদের নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে।
ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের (আইডিএমসি) ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত বছর বাংলাদেশে ১৫ লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ৭৬ শতাংশ শিশু ইতিমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করছে—সংখ্যায় যা প্রায় ৪৬ কোটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এই সংকটের প্রধান কারণ। অথচ ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ দরিদ্র ও উপকূলীয় দেশগুলোকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, দুর্যোগ-পরবর্তী স্বচ্ছ সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট। তবে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উপকূলের মানুষের এই চতুর্মুখী বিপদের শেষ কোথায়—সে প্রশ্নের উত্তর আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়বে আজকের শিশুরা, যারা আগামী দিনের বাংলাদেশ।
