উপকূলে ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে অবৈধ বালি উত্তোলন, বাড়ছে নদীভাঙনের ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় নদ-নদী ও ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের কারণে তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন ও পরিবেশগত ঝুঁকি। বিশেষ করে পশ্চিম সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রা, দাকোপ ও শ্যামনগর অঞ্চলে খননযন্ত্র ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশবিদদের অভিযোগ, অবৈধ বালি উত্তোলনের ফলে নদীতীর ও বেঁড়িবাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের অংশ ও উপকূলীয় জনপদও ধীরে ধীরে ক্ষতির মুখে পড়ছে।

স্থানীয়দের মতে, খোলপেটুয়া, কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া, শিবসা, ঢাকী, কাজীবাছা, পশুরসহ একাধিক নদী থেকে অবাধে বালি তোলা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়ে ভাঙন তীব্র হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় গাছপালা ভেঙে নদীতে পড়ছে এবং ভাঙনের পরিধি বাড়ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনা-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহির মাজাহার বলেন, “অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের কারণে নদীতীরে বড় গর্ত তৈরি হচ্ছে। সেই গর্তে বেঁড়িবাঁধ ধসে ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন Sundarbans ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর ওপর অবৈধ বালি উত্তোলন নতুন সংকট তৈরি করছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, “সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলকে রক্ষা করে। কিন্তু অপরিকল্পিত ও অবৈধ ব্যবহার এর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।”

খুলনা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নির্ধারিত বালুমহালের বাইরে বালি উত্তোলনের কোনো অনুমতি নেই। পাশাপাশি বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, নদীতীর বা ভাঙনকবলিত এলাকায় বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আইন উপেক্ষা করে প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে বালি উত্তোলন করছে।

পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, “সুন্দরবনসংলগ্ন নদী থেকে বালি উত্তোলন বন ও পরিবেশের জন্য হুমকি। বিষয়টি আমরা আগে নিষেধ করেছি, তবে অনেকে অনুমতির কথা বলছেন।”

খুলনার জেলা প্রশাসক আ, জ, স, ম জামশেদ খন্দকার বলেন, “কয়রা ও দাকোপের নদ-নদী থেকে বালি উত্তোলনের কোনো অনুমতি নেই। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনক বলেন, “ভাঙনকবলিত ও ইজারাবহির্ভূত এলাকা থেকে বালি উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভূমি কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে রাতের আঁধারে বালি উত্তোলন করছে। এতে ভাঙনকবলিত এলাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

কয়রার বাসিন্দা ইউনুছ আলী বলেন, “প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বালি তুলছে। কেউ কেউ ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তিও করে বালি সরবরাহ করছে।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও একই অভিযোগ করেছেন। কয়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, “জরিমানা হলেও বালি উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। এতে নদীভাঙন বাড়ছে।”