উপকূলবাসীর জীবনযুদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা : বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের দৈর্ঘ্য ৭১১ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও জোয়ার–ভাটা উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবনের অংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব দুর্যোগ এখন আর ব্যতিক্রম নয়—বরং নিয়মিত বাস্তবতা। উপকূলবাসীর জীবন তাই এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের নাম।

উপকূল রক্ষায় বেড়িবাঁধ ও সবুজ বেষ্টনী তৈরির কথা বহুবার বলা হয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, তিন–চার দশক আগের বেড়িবাঁধগুলো নানা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও অসাধু চক্র বন কেটে চিংড়িঘের গড়ে তুলেছে। ফলে উপকূল আজ অনেকাংশেই অরক্ষিত।

১৯৬৬ সালে বাংলাদেশে ম্যানগ্রোভ বনায়নের সূচনা হয়। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প গুরুত্ব পায়। কারণ, বেড়িবাঁধের সামনে পরিকল্পিত বনায়ন জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। অথচ বাস্তবতায় দেখা যায়, উপকূলীয় বেষ্টনীর বড় অংশ উজাড় হয়ে গেছে। বনদস্যু, কাঠ ব্যবসায়ী, অপরিকল্পিত চিংড়িচাষ ও লবণ চাষ—সব মিলিয়ে উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বরগুনার বিষখালী নদী কিংবা সাতক্ষীরার কয়রা, শ্যামনগরের নদীগুলো তার সাক্ষী। সিডর, আইলা, আমফান, ইয়াস—প্রতিটি দুর্যোগ মানুষকে নিঃস্ব করেছে। ঘরবাড়ি, ফসল, গাছপালা ভেসে গেছে বারবার। তবু উপকূলবাসী হার মানেনি। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই তারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে।

সাতক্ষীরার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন তার এক বাস্তব উদাহরণ। কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া ও আড়পাঙ্গাসিয়া নদী দিয়ে ঘেরা এই জনপদটি যেন পানির ওপর ভাসমান এক দ্বীপ। ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধ, লবণাক্ত পানি আর ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্ক এখানে নিত্যসঙ্গী।

চরামুখার কপোতাক্ষপাড়ে বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করা মোছা. রফিউন নেসার জীবনই উপকূলের প্রতিচ্ছবি। স্বামীহারা এই নারী চার সন্তান নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কুঁড়েঘরে থাকেন। সিডর, আইলা, আমফান—প্রতিটি দুর্যোগ তার ঘর ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। নদীর মাছই তার একমাত্র জীবিকা। মাছ না পেলে সন্তানদের নিয়ে অনাহার–অর্ধাহারে দিন কাটে। নদীতে ভেসে আসা সুন্দরবনের ডালপালা কুড়িয়ে জ্বালানি জোগাড় করতে হয়।

এই এলাকার মানুষের জীবিকা নদী ও বননির্ভর। মাছ, কাঁকড়া, মধু সংগ্রহ করেই চলে সংসার। কিন্তু বনে ঢুকতে হলে একদিকে বনবিভাগের নিয়ম, অন্যদিকে বনদস্যুদের চাঁদা—দুইয়ের মাঝেই জীবন ঝুঁকির মুখে। বাঘের আক্রমণে আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা এখানে নতুন নয়।

স্থানীয় শিক্ষক মাওলানা মাহফুজুর রহমান বলেন, “এখানে বেড়িবাঁধ মানেই জীবন। বাঁধ ভাঙলে সব শেষ। আশ্রয়কেন্দ্রও পর্যাপ্ত নয়। মানুষ সব সময় আতঙ্কে থাকে।”

পানির সংকটও ভয়াবহ। সাধারণ নলকূপে বছরের কয়েক মাস পানি পাওয়া যায় না। কিছু এনজিও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। চিকিৎসা নিতে উপজেলা সদর পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৩০ কিলোমিটার। ফলে অনেকেই গ্রাম্য চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, দক্ষিণ কয়রার বেদকাশী ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। প্রকল্পটি শেষ হলে কিছুটা নিরাপত্তা মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে উপকূলবাসীর অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু বাঁধ মেরামত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে মানুষ চিংড়িচাষে ঝুঁকছে। কিন্তু সেখানে মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেটের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা। দেশি মাছ কমে যাচ্ছে কারেন্ট জাল ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে।

উপকূলের মানুষ ত্রাণ নয়, চায় টেকসই সমাধান। চায় নিরাপদ বেড়িবাঁধ, পরিকল্পিত বনায়ন, সুপেয় পানি, চিকিৎসা ও শিক্ষার নিশ্চয়তা। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করে। তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, জাতীয় স্বার্থেরও অংশ।

প্রতিটি দুর্যোগের পর উপকূলবাসী আবার দাঁড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—তারা কত দিন এভাবে দাঁড়াবে? রাষ্ট্র যদি এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না নেয়, তবে উপকূলের এই জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।