বিলুপ্তির পথে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী মাদুর শিল্প, সহায়তার দাবি কারিগরদের

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

সিরাজুল ইসলাম : একসময় সাতক্ষীরার গ্রামগুলোতে মাদুর বোনার শব্দে মুখর থাকত প্রতিটি ঘর। জেলার আশাশুনি ও তালা উপজেলার হাজারো পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল এই পরিবেশবান্ধব শিল্প। কিন্তু সময়ের স্রোতে কাঁচামালের অভাব আর প্লাস্টিকের পণ্যের ভিড়ে আজ বিলুপ্তির পথে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী এই মাদুর শিল্প। ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকার সন্ধানে ছুটছেন শত শত কারিগর।

একসময়ের রমরমা বাণিজ্য দুই দশক আগেও জেলার আশাশুনি উপজেলার বড়দল, কুল্যা ও কাদাকাটি ইউনিয়নের ৯০ শতাংশ পরিবার মাদুর উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তখন স্থানীয়ভাবে প্রচুর ‘মেলে ঘাস’ জন্মাত, যা দিয়ে তৈরি হতো উন্নত মানের মাদুর। বড়দল ও বুধহাটার হাটে প্রতি সপ্তাহে শত শত জোড়া মাদুর বেচাকেনা হতো, যা খুলনা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেত। কিন্তু বর্তমানে হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা নেই বললেই চলে।

কেন এই সংকট? কারিগর ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদুর শিল্পের পতনের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

কাঁচামালের অভাব: আগে এলাকায় প্রচুর মেলে বা পাতি ঘাস জন্মালেও এখন তা আর মেলে না। বাইরে থেকে চড়া দামে কাঁচামাল কিনে এনে উৎপাদন খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্লাস্টিকের আধিপত্য: বাজারে সস্তায় প্লাস্টিকের মাদুর ও বেডশিটের সহজলভ্যতায় পরিবেশবান্ধব মেলে মাদুরের চাহিদা ও কদর অনেকটাই কমে গেছে।

অলাভজনক পেশা: একটি ছোট আকারের মাদুর তৈরিতে খরচ হয় ২০০-২৫০ টাকা, যা বিক্রি হয় ৩৫০ টাকার মধ্যে। বড় মাদুরের ক্ষেত্রেও লাভের পরিমাণ খুবই নগণ্য। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় অনেক কারিগর এখন ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন বা শহরে ভ্যান চালাচ্ছেন।

অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই আশাশুনি উপজেলার মাদুর কারিগর সুধীর মন্ডল ও তারা পদ মন্ডল বলেন, “চার পুরুষ ধরে এই কাজ করে আসছি। বয়স হয়েছে, অন্য কোনো কাজ জানা নেই। লাভের মুখ দেখি না, তবুও পূর্বপুরুষের পেশা হিসেবে এটি কোনোমতে আঁকড়ে ধরে আছি।”

সাতক্ষীরা সুলতানপুর বড় বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী কওছার আলী জানান, প্লাস্টিকের মাদুরের তুলনায় মেলের মাদুরের দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এতে ব্যবসায়ীরাও আগের মতো আগ্রহী হচ্ছেন না।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উত্তরণের পথ সাতক্ষীরা শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠু বলেন, “সাতক্ষীরার মাদুর শিল্প একটি ঐতিহ্য। এই পেশার মানুষেরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে হলে সহজ শর্তে ঋণসহায়তা এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা প্রয়োজন। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে সাতক্ষীরা থেকে এই শিল্প পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।”

বিসিক শিল্পনগরী সাতক্ষীরার উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস জানান, “আমরা এই শিল্পকে আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছি। এই শিল্পের বাজার সম্প্রসারণের জন্য বিসিকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও আধুনিক ডিজাইনের মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে সাতক্ষীরার এই পরিবেশবান্ধব মাদুর শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কেবল সরকারি সহায়তা নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারে উৎসাহী হওয়াও জরুরি।