দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি: নাভারন-ভোমরা রেলপথ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি | সাতক্ষীরা : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার। এতদিন জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা এ জেলা যুক্ত হতে যাচ্ছে রেল যোগাযোগে। যশোরের নাভারন থেকে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, নাভারন-ভোমরা রেলপথ নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে ঋণ সহায়তা হিসেবে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সয়েল টেস্ট, জমি চিহ্নিতকরণ এবং ছয়টি স্টেশন নির্ধারণের কাজ শেষ হয়েছে।

ছয়টি আধুনিক স্টেশন

নতুন রেলপথে নাভারন, কলারোয়া, মাধবকাঠি, সাতক্ষীরা সদর ও ভোমরা স্থলবন্দরসহ ছয়টি স্থানে আধুনিক স্টেশন নির্মাণ করা হবে। নাভারনে একটি আন্তঃনগর মানের রেলস্টেশন গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব

রেললাইন চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, শিল্প, পর্যটন ও বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। হিমসাগর আম, রপ্তানিযোগ্য হিমায়িত চিংড়ি, সুন্দরবনের মধু ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন–কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেললাইন রয়েছে এবং ৪৪টি জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। সরকারের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও ১৫টি জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নাভারন-ভোমরা রেলপথ সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দীর্ঘ ইতিহাসের অপূর্ণ স্বপ্ন

ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলের সঙ্গে রেলের সম্পর্ক নতুন নয়। ১৮৬২ সালে দর্শনা-জগতি রেললাইন দিয়ে বাংলায় রেলযাত্রার সূচনা হলেও সাতক্ষীরা সেই সংযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ আমলে নাভারন হয়ে সাতক্ষীরা ও সুন্দরবন পর্যন্ত রেল সংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। দেড় শতাব্দী পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে।

সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া

ভোমরা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেন, এ রেলপথ শুধু যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটাবে। রেল যোগাযোগ চালু হলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে, পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।

কলারোয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সানসিলা জেবরিন বলেন, বর্তমানে যাতায়াতে সময় ও ভোগান্তি বেশি। রেললাইন চালু হলে শিক্ষার্থীদের জন্য যাতায়াত সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে।

বেনাপোল রেলস্টেশন–এর স্টেশনমাস্টার আয়নাল হাসান জানান, জমি নির্ধারণ, সয়েল টেস্ট ও স্টেশন পরিকল্পনার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। নাভারনে একটি আন্তঃনগর মানের রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে এবং শিগগিরই প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।

নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

রেল যোগাযোগের বাইরে থাকা সাতক্ষীরা এবার জাতীয় রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে যাচ্ছে। নাভারন থেকে ভোমরা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের।