
সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : উত্তরের হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। গত কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা না মেলায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে কয়েক গুণ। কনকনে ঠান্ডা ও আর্দ্র বাতাসে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকালে সাতক্ষীরায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ। ফলে রোদ না উঠলেও শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হতদরিদ্র, ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষ পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
সোমবার সকাল থেকেই জেলার ওপর দিয়ে কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইছে। ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বেলাতেও অনেক এলাকায় যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে দেখা গেছে। গত ৪৮ ঘণ্টা সূর্যের তাপ না থাকায় ভূপৃষ্ঠ হিমশীতল হয়ে পড়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বাইরে বের হওয়া মানুষের শরীরে দেখা যাচ্ছে ভারী শীতবস্ত্র।
শহরের মোড়ে মোড়ে এবং গ্রামাঞ্চলে ছিন্নমূল মানুষদের খড়কুটো, কাঠ ও আবর্জনা জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। তীব্র শীত উপেক্ষা করেও অনেক শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার তাগিদে কাজে বের হচ্ছেন।
সাতক্ষীরা শহরের পাকাপুল মোড়ে কাজের অপেক্ষায় থাকা দিনমজুর শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত দুই দিন রোদ নেই। তার ওপর কনকনে বাতাস। হাত-পা জমে যাচ্ছে। তবুও কাজে বের হতে হয়। কাজ না করলে পেটে ভাত জুটবে না।’
রাজারবাগান এলাকার ভ্যানচালক জসিম উদ্দীন বলেন, ‘রোদ না ওঠায় যাত্রী কমে গেছে। শীতেও কষ্ট হচ্ছে।’
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অ্যাজমা, হাঁপানি ও সর্দি-জ্বরে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক রিয়াদ হাসান বলেন, ‘এই আবহাওয়ায় শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে ঝুঁকিতে। শীত থেকে বাঁচতে গরম কাপড় ব্যবহার এবং কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর ও রাত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী, ভামিয়া, মুন্সিগঞ্জ জেলে পল্লী ও নীলডুমুর এলাকায় শীতের প্রকোপ আরও ভয়াবহ। সন্ধ্যার পর খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা যায় জেলেপল্লীর মানুষদের।
মুন্সিগঞ্জ জেলে পল্লীর গোপাল সানা বলেন, ‘ঘরের ভেতরেও ঠান্ডায় থাকা দায়। তাই কয়েকজন মিলে আগুন জ্বালিয়ে শীত তাড়ানোর চেষ্টা করি।’
একই এলাকার বিধবা সোনামণি দাসী বলেন, ‘একটাই পাতলা ছেঁড়া কম্বল। রাতে ওইটাই সম্বল। শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। সন্ধ্যা হলেই শরীর কাঁপে।’
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ভামিয়া গ্রামের গফুর সরদার (৭২) বলেন, ‘মানুষের কাছে হাত পেতে সংসার চলে। শীতের কাপড় কেনার পয়সা নেই। এত শীত পড়লেও কেউ একটা কম্বল দেয়নি।’
জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেল জানায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ চলছে। তাপমাত্রা আরও কমলে বিতরণ কার্যক্রম বাড়ানো হবে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. রনী খাতুন বলেন, উপজেলায় এখন পর্যন্ত ছয় লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এ অর্থে ৯৪৭টি কম্বল কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০০টি বিতরণ করা হয়েছে, বাকিগুলো বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, জানুয়ারি মাসজুড়েই এমন আবহাওয়া থাকতে পারে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে তাপমাত্রা আরও কমে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
সমাজকর্মী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের এগিয়ে আসা এখন খুব জরুরি।’
