প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অরক্ষিত ভেড়িবাঁধ: জীবন চলছে উপকূলের মানুষের সংগ্রামে

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের কাছে ঘূর্ণিঝড় আর কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি যেন একটি অনাগত বিপদের ছায়া, যে বিপদ প্রতিটি মৌসুমেই আসে। বছরের বর্ষা মৌসুমের আগে কিংবা পরে আকাশে মেঘ দেখা গেলেই উপকূলের মানুষদের মধ্যে এক অস্বস্তি তৈরি হয়। এই মেঘের আড়ালে আছড়ে পড়তে পারে তাদের জীবনকে ধ্বংস করে ফেলা কোনো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়—এটাই তাদের চিরকালীন আতঙ্ক।

বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ: বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে নিচু এবং সমতল, তাই এই অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূলরেখা এই ঝড়গুলোকে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এর উপর যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে আরও ভয়াবহ এবং ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করছে। ফলে, যা একসময় প্রকৃতির নিয়মিত বৈশিষ্ট্য ছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে একটি প্রাণসংহারী এবং নিয়মিত ঘটনা।

তবে, এই বিপরীত প্রকৃতির চরম আক্রমণের বিরুদ্ধে উপকূলকে রক্ষা করে সুন্দরবন—বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। কিন্তু এই বনও আজ বিপন্ন। বনখেকোদের আগ্রাসন, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের রক্ষা ক্ষমতা অনেকাংশে হ্রাস পাচ্ছে। এই বনের অস্তিত্ব রক্ষা না হলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের জন্য ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ভাবতে গেলে ভয় লাগে।

অরক্ষিত বেড়িবাঁধ ও দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা: উপকূলীয় মানুষের জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ হলো অরক্ষিত বেড়িবাঁধগুলো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বেশিরভাগ বেড়িবাঁধ অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্নীতি এবং নদী ভাঙনের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। একটি বড় ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস আসলে এই বাঁধগুলো হয় ভেঙে যায়, নয়তো তার শক্তি থাকে না। এই দুর্বল বাঁধগুলির কারণে উপকূলের মানুষের জীবিকা হারানোই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

এছাড়া, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোও পর্যাপ্ত নয়। যে কয়টি আশ্রয়কেন্দ্র আছে, সেগুলোর অধিকাংশই মূল বসতি থেকে অনেক দূরে অবস্থিত, যা নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের জন্য সেখানে পৌঁছানো অনেক কঠিন করে তোলে। এবং দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর পরিবেশও খুব অস্বাস্থ্যকর হয়ে যায়।

উপকূলের ক্ষত, মানসিক প্রভাব এবং পুনর্গঠন: ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলের মানুষ যে গভীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তা অনেক সময় ত্রাণ কার্যক্রমের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে শিশুদের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়। হারানোর বেদনা, ভয় এবং উদ্বেগ তাদের মনে এক স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে, যা কোনো ত্রাণ বা পুনর্বাসন কার্যক্রম দিয়েও পূর্ণভাবে ঠিক করা সম্ভব নয়।

নারী ও শিশুর বিশেষ দুর্ভোগ: দুর্যোগের সময়ে এবং পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয় নারী ও শিশু। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানির অভাব, এবং শারীরিক নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ে তারা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েন। বিশেষ করে, নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার, দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে সংসারের হাল ধরতে নারীদেরই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, যা তাদের আরও নিঃশেষিত করে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অপরাধ প্রবণতা: ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি শুধু শারীরিক নয়, এটি আর্থিক ক্ষতিরও এক বড় কারণ। বাঁধ ভেঙে নদীর লোনা পানি উপকূলে ঢুকে পুকুর, টিউবওয়েল, ক্ষেতের ফসল—সবকিছু নষ্ট করে দেয়। চিংড়ি চাষ বা অন্য পেশায় ঝুঁকতে গিয়ে কৃষকদের উর্বর জমি বন্ধ্যা হয়ে পড়ে। কৃষি অর্থনীতির এই বিপর্যয় অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিরও অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নতুন পথে অভিযোজন: তবে উপকূলের মানুষ শুধু হারিয়ে যান না। তারা শিখে নিয়েছে কিভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করতে হয়। নিজেরাই নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিচ্ছে, নিজস্ব কৌশলে নিজেদের ঘরবাড়ি মজবুত করছে, এবং নতুন ধরনের ফসল চাষ করছে যা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। অনেকেই মাটির ভিটার উচ্চতা বাড়িয়ে ঘর তৈরি করছে। এমনকি কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি দল গঠন করে তারা একসাথে দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা নিচ্ছে।

নতুন জাতীয় পরিকল্পনা জরুরি: এখন প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মোকাবিলা কীভাবে হবে? সঠিক পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া শুধু ত্রাণ বা তাৎক্ষণিক সাহায্য দিয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যার মধ্যে থাকবে শক্তিশালী বেড়িবাঁধ, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, টেকসই কৃষি ব্যবস্থা এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ।

সংবিধানিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা: বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ সুরক্ষার কিছু বিধান থাকলেও তা কার্যকরী হতে পারেনি। জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় সংবিধানে নতুন কিছু বিধান অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। ইকুয়েডর, বলিভিয়া, ফ্রান্স এবং নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যেই তাদের সংবিধানে পরিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নকে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করার জন্য নতুন বিধান যোগ করলে দেশটি একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

শেষ কথা: উপকূলীয় অঞ্চলের জীবন চলছে এক সংগ্রামের মধ্যে। সেই সংগ্রামের শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না। তবে যেটি নিশ্চিত, তা হলো—যতদিন এই মানুষেরা সুন্দ

রবন ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধের সুরক্ষায় সচেতন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতি টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি না করা যায়, ততদিন তাদের জীবন সংগ্রাম চলতেই থাকবে।