
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের ঢল বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাঙা হচ্ছে ঝিনুক–শামুকের অলংকার শিল্প। সৈকতসংলগ্ন ঝিনুক মার্কেটগুলোতে এখন রঙিন ঝিনুক, কড়ি, শামুক আর প্রবালের তৈরি নানা কারুকাজে সাজানো দোকান। পর্যটকেরা প্রিয়জনের জন্য সংগ্রহ করছেন এসব ‘সাগরের অলংকার’। বালিয়াড়ির পাশের এই বাজার এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে বসে ঝিনুকের ওপর নাম খোদাই করছেন কারিগর মনজুর। বয়স ২৭। বাহারছড়ার এই তরুণ ছোটবেলা থেকেই শামুক–ঝিনুকের কাজে যুক্ত। তার দুটি দোকানে রয়েছে নারীদের অলংকার, ঘর সাজানোর সামগ্রী, চাবির রিংসহ দৃষ্টিনন্দন পণ্য। মৌসুমে বেচাকেনাও থাকে জমজমাট। মনজুরের স্বপ্ন—নিজে পড়াশোনা না করলেও ভাইবোনদের উচ্চশিক্ষিত করা।
নুরজাহান বেগমের গল্প আরও অনুপ্রেরণাদায়ক। স্বামীর মৃত্যুতে তিন সন্তানের দায়িত্ব যখন একা তাঁর কাঁধে, তখনই দু’হাতের জোরে শুরু করেন ঝিনুকের অলংকার বানানোর কাজ। ১৫–১৬ বছরের পরিশ্রমে এখন তার রয়েছে ১৫ নারী কর্মচারীর দল। তৈরি হয় মালা, দুল, পুতুল, ব্রেসলেট, ঝাড়বাতি, ল্যাম্পশেডসহ নানা শিল্পপণ্য। পর্যটন মৌসুমে তাদের ব্যস্ততা বাড়ে কয়েক গুণ। নুরজাহান এখন নিজের সংসারে সচ্ছলতার মুখ দেখেছেন।
পণ্যের দামও হাতের নাগালে— • নাম খোদাই ৬০–২০০ টাকা • ঝিনুক পুতুল ১০০–৪০০ টাকা • ঝাড়বাতি ৮০০–৩,০০০ টাকা • মুক্তার মালা ১০০–২,৫০০ টাকা • কানের দুল, চুড়ি, আংটি ৫০–৫৫০ টাকা • শামুকের ব্যাগ ৮০০–২,৫০০ টাকা • প্রবাল পাথর ৮০০–৩,৫০০ টাকা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক দম্পতি হুমায়ারা ও মহসীন আনোয়ার বলেন, ‘কক্সবাজার এলে ঝিনুক না কিনলেই যেন অসম্পূর্ণ লাগে।’ খুলনার ইবতিহাজ আহম্মদও শখ করে কিনেছেন প্রায় ১০ হাজার টাকার ঝিনুক সামগ্রী, আত্মীয়দের উপহার দেওয়ার জন্য।
মার্কেটের বিক্রেতা মোর্শেদ হোসেন জানান, মৌসুমে প্রতিদিন ২০–৩০ হাজার টাকার বিক্রি হয়, ছুটির দিনে তা ৫০ হাজার ছাড়ায়। বর্তমানে লাবণী, জেলে পার্ক, বার্মিজ মার্কেটসহ সৈকত এলাকায় প্রায় ৪০০ দোকান চলছে এই শিল্পের ওপর ভর করে। উপকূলের লোকজন শামুক–ঝিনুক সংগ্রহ করে এসব দোকানে সরবরাহ করেন।
তবে শঙ্কাও আছে। ঝিনুক ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদিন সুফি জানান, আগে শতাধিক প্রজাতির শামুক–ঝিনুক পাওয়া গেলেও এখন নামমাত্র। পরিবেশদূষণ ও আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় বহু প্রজাতি বিলুপ্ত। তাঁর দাবি, সরকারিভাবে নীতিমালা ও সেফ জোন তৈরি করলে এই ঐতিহ্য রক্ষা পাবে।
কক্সবাজার চেম্বার সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, করোনার ধাক্কায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যটন শিল্প পুনরুদ্ধারে বিশেষ পরিকল্পনা ও প্রণোদনার প্রয়োজন।
সৈকত ঝিনুক শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি কাসিম আলীর মতে, ঝিনুক চাষে দেশে বিশাল সম্ভাবনা আছে। ‘মুক্তার মতো মূল্যবান বস্তু এখান থেকেই পাওয়া যায়। শিল্পটিকে গুরুত্ব দিলে বৈদেশিক মুদ্রা যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।’
ঝিনুকের ঝলমলে কারুকাজ শুধু পর্যটকদের আনন্দই নয়—উপকূলের বহু মানুষের জীবিকার চাকা ঘুরিয়ে রাখছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও সুরক্ষা পেলে এই সম্ভাবনাময় শিল্প আগামীতেও কক্সবাজারের পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকবে।
