

সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি
ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা উপকরণে ভরপুর আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা চিরায়ত এই বাংলার অপরূপ রূপে বরীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন, ‘অবারিত মাঠ গগনলাঠ, চুমে তব পদ/ধূলি, ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলো। সবুজ গাছপালা আর লতাপাতা বেষ্টিত বাংলা মায়ের রূপ বর্ণনায় কবি বন্দে আলী মিয়া লিখেছেন, ‘আমাদের গ্রাম খানি ছবির মতন/মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন’।
এভাবেই বঙ্গের কবি সাহিত্যিকগণ অসংখ্য কবিতা ও গানের মাধ্যমে আবহমান গ্রাম-বাংলার মনোমুগ্ধকর চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন। নদী বিধৌত এদেশের পলি মাটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে সোনার খনি। দিগন্ত জোড়া চোখধাঁধানো ফসলের মাঠ, সবুজ গাছ-পালা, নদ-নদী, হাওড়-বাঁওড় এসবই পল্লী মায়ের অলঙ্কার। আমাদের গ্রামগুলো এক সময় ছিল ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা। সারা দিনব্যাপী শোনা যেত পাখির কলরব। রাতের বেলায় জোনাকি পোকার আলো, বর্ষাকালে শাপলা-শালুক ফোটা ফুলের গন্ধে মৌমাছির গুঞ্জন, পানকৌড়ি, বালিহাঁস ধানের খেতে গড়িয়াল আকাশে উড়ন্ত রাজশকুনের ঝাঁক এসব আজকাল চোখে পড়ে না। দিদিমার মুখে রূপকথার গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়া, বারো মাসে তেরো পার্বণ, পৌষ সংক্রান্তির মেলা, শীতের পিঠা, গাজীর গান, টপ্পা, নদীর বুকে পাল তোলা নৌকায় মাঝি মাল্লার কণ্ঠে ভাটিয়ালি গানের সুর যেন মন কেড়ে নিত। শীতকালে হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, কানামাছি খেলা এসবই ছিল বাঙালীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। এক সময়ে প্রতিটি বাড়ি ছিল একান্নবর্তী পরিবার।
মা-বাবা ভাই-বোন দাদা-দাদি, সকলে মিলেমিশে একত্রে বসবাস করার কোন তুলনাই ছিল না। নগর সভ্যতা ও শিল্প-বাণিজ্য প্রসারের ফলে ধীরে ধীরে গ্রামীণ জীবনেও আধুনিকতার ছোয়ায় পরিবর্তন হতে থাকে। প্রতিটি গ্রাম বিদ্যুতায়নের ফলে ইন্টারনেট সেবা, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে। বেড়েছে আয়ের উৎস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। পক্ষান্তরে গ্রামীণ জীবনে দেখা দিয়েছে নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব, বিষণœতা। যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট পরিবার। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি গ্রামের মানুষের মধ্যে ছিল উদারতা, সরলতা, সহমর্মিতা। গ্রাম-বাংলায় এক সময়ে প্রবাদ ছিল মাছে-ভাতে বাঙালী। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল দুধ-ভাতও। গোলাভরা ধান, বাটাভরা পান, পুকুরভরা মাছ, ফলভরা গাছ এসবই ছিল গ্রামের পরিপূর্ণ রূপ। আধুনিকতার ফলে গ্রামীণ মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে গেছে চাহিদার পরিমাণ। এসব পূরণ করতে গাছপালা ও ফসলি জমি ধ্বংস করে তৈরি করা হচ্ছে ইট, পাথরের ইমারত। হারিয়ে যাচ্ছে নদী-নালা, পুকুর জলাশয়। শেষ হয়ে যাচ্ছে পশু-পাখির অভয়ারণ্য। গাছ-পালা কমে যাওয়ার ফলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দেখা দিচ্ছে নানা রকমের জটিল কঠিন রোগ-বালাই। কৃষিবিদদের মতে মৌমাছি ও অন্যান্য প্রাণী বিলুপ্তির কারণে কৃষিক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পরছে। কৃষি প্রধান এই বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে কৃষক। তারা কিন্তু গ্রামেই বাস করে। আমরা যারা শহরের শিক্ষিত আধুনিক মানুষ বলে দাবি করি তাদের জন্মও কিন্তু গ্রামেই। অতএব গ্রাম হচ্ছে আমাদের ভালবাসা ও অস্তিত্বের শিকড় এবং জাতীয় অর্থনীতির মেরুদ-।
গ্রামের মানুষের কথা অনুধাবন করেই স্বাধীনতার পর গ্রাম উন্নয়নে সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। আজ তাঁরই কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিটি গ্রামকে শহরের আদলে গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।
তিনি এ কথাও বলেছেন, দেশে সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকা- চলবে তবে তা গ্রামের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করে, ধ্বংস করে নয়। গ্রাম হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। অনেক গ্রামে এখনও দুই থেকে তিন শ’ বছরের বটবৃক্ষ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শহরের লাইটের চোখ ঝলসানো আলো, যানবাহনের বিকট শব্দ, বিষাক্ত বাতাসের চেয়ে গ্রামের সবুজ প্রকৃতি, ভোরের সূর্যকিরণ, নির্মল বায়ু, শিশির ভেজা ঘাসে হেঁটে চলা মানবদেহের জন্য অনেকাংশেই শ্রেয়। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই গ্রাম উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামের উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন, দেশের উন্নয়ন মানেই ১৬ কোটি মানুষের জীবনের পরিবর্তন।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com