সুন্দরবনে পুরনো ভূত: জীবিকার বন এখন শত্রু

নিজস্ব প্রতিবেদক: Farzana Akter Bristy
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : সুন্দরবন-কে ২০১৮ সালে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই বনেই আবার ফিরে এসেছে পুরোনো আতঙ্ক। অপহরণ, মুক্তিপণ, চাঁদাবাজি আর নির্যাতনের নতুন করে বিস্তার ঘটেছে উপকূলজুড়ে। যে বন একসময় হাজারো বনজীবীর জীবিকার উৎস ছিল, তা এখন তাদের কাছে ভয়ের আরেক নাম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পুরোনো আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের সঙ্গে নতুন গোষ্ঠী যুক্ত হয়ে অন্তত ২০টি দস্যু বাহিনী বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে তাদের দৌরাত্ম্য বেশি।

গত এক বছরে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া তিন শতাধিক জেলে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। কেবল গত এক মাসেই শতাধিক জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করেছে দস্যুরা। ভুক্তভোগীদের পরিবার জানায়, মুক্তিপণ হিসেবে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।

শরণখোলা এলাকার এক মাছ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দস্যুদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। তাদের সোর্স সব জায়গায় আছে। কিছু বললে পরে বনে গেলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়।”

জেলেদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে দস্যুরা। প্রতিটি নৌকার জন্য ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়। বিনিময়ে দেওয়া হয় একটি ‘টোকেন’, যা বনে নিরাপদে মাছ ধরার পাস হিসেবে কাজ করে। টোকেন না থাকলে জেলেদের অপহরণ বা মারধরের শিকার হতে হয়।

স্থানীয় জেলেরা জানান, দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে বন ভাগ হয়ে গেছে। প্রতিটি এলাকায় আলাদা বাহিনীর প্রভাব রয়েছে।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে জাহাঙ্গীর বাহিনী, মনজুর বাহিনী, দাদা ভাই বাহিনীসহ অন্তত ২০টি বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া করিম-শরিফ, দয়াল, রবি, সুমন, আলিফ বাহিনীসহ আরও কয়েকটি দল বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও অপহরণে জড়িত।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “দস্যুদের সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলার মতো প্রস্তুতি আমাদের সীমিত। তবে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি।”

অন্যদিকে কোস্টগার্ড জানায়, গত এক বছরে ২৭টি অভিযান চালিয়ে ৪৪ জন দস্যু ও সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ। পাশাপাশি ৪৮ জন জেলেকে দস্যুদের হাত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বনসংলগ্ন এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি দস্যুদের হয়ে মধ্যস্থতাকারীর কাজ করছেন। তারা অপহৃত জেলেদের পরিবার ও মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দস্যুদের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে দস্যুদের একটি শক্তিশালী তথ্য ও অর্থের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।

দস্যু আতঙ্কে অনেক জেলে এখন আর বনে যেতে চান না। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে। মাছ ধরা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর নেতা নুর আলম শেখ বলেন, “সুন্দরবন আবার আগের মতো ভয়াবহ অবস্থায় ফিরছে। বনজীবীরা বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন, যা উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।”

দস্যুরা শুধু অপহরণ বা চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের বিরুদ্ধে বাঘ, হরিণ শিকার, কাঠ পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, “দস্যুদের দমন শুধু আইন প্রয়োগ দিয়ে সম্ভব নয়। তাদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”

জোয়ার-ভাটার এই বনে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবনের গল্প। কিন্তু দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্বল আইন প্রয়োগ আর দুর্নীতির কারণে সেই বনই এখন তাদের কাছে আতঙ্কের প্রতীক। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সুন্দরবন আবারও জলদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।