সুন্দরবনের ৬ হাজার কিলোমিটারজুড়ে ফের দস্যু আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ২ মাস আগে

অপহরণ, মুক্তিপণ আর অনিশ্চয়তায় জেলেপল্লি; নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুন্দরবনের নদী ও খালজুড়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দস্যু আতঙ্ক। জীবিকার তাগিদে যারা প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে নদীতে নামেন, সেই জেলেদেরই এখন অপহরণ ও মুক্তিপণের ভয় নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ২২ জন জেলেকে অপহরণের ঘটনায় পুরো উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা।

অপহৃত জেলেদের পরিবারের সদস্যরা দিন কাটাচ্ছেন চরম উৎকণ্ঠায়। অনেক পরিবারে দিনের পর দিন চুলা জ্বলছে না। সন্তানদের চোখে ঘুম নেই, আর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে উপকূলের জনপদ। স্থানীয়দের প্রশ্ন, স্বাধীন দেশে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?

২০১৮ সালে সরকারিভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে অনেক দস্যু আত্মসমর্পণ করেন। কিছুদিনের জন্য বনাঞ্চলে স্বস্তিও ফিরে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিস্থিতি আবারও বদলে যেতে শুরু করেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নতুন ও পুরোনো দস্যু বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। বর্তমানে বনাঞ্চলে অন্তত ১৬টি ছোট-বড় দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এর মধ্যে করিম-শরীফ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, আলিফ বাহিনী, বুড়ো জাহাঙ্গীর বাহিনী, সবুজ-জাহাঙ্গীর বাহিনী, আল-আমীন বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জনাব বাহিনী ও আসাবুর গ্রুপের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, দস্যুরা গভীর বনাঞ্চল ও নদীপথকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে। সুযোগ বুঝে মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকা থামিয়ে জেলেদের অপহরণ করা হচ্ছে। পরে তাঁদের মুক্তির জন্য পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণ দিতে দেরি হলে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দস্যু আতঙ্ক এখন শুধু জেলেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পেও। বিভিন্ন সময়ে পর্যটকবাহী ট্রলার ও রিসোর্টে ডাকাতির চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে। এতে পর্যটকদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সুন্দরবনের পর্যটন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান জোরদার করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত দেড় বছরে বিভিন্ন অভিযানে ৬১ জন দস্যুকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও দেশীয় অস্ত্র।

তবে উপকূলের মানুষ বলছেন, শুধু অভিযান চালালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁরা নদীপথে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী এলাকার জেলে মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। নদীতে না গেলে অনাহারে থাকতে হয়। কিন্তু এখন নদীতে গেলেও ভয়—ফিরে আসতে পারব তো? প্রায়ই শুনি, কোনো না কোনো জেলেকে ডাকাতরা তুলে নিয়ে গেছে।”

দাকোপ উপজেলার সুতারখালী এলাকার অরিবিন্দু মণ্ডল বলেন, “সাহস করে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। কিন্তু আবার ভয় হয়, ডাকাত যদি ধরে? টাকা পাব কোথায়? বন বিভাগ টাকা নিয়ে পাস-পারমিট দেয়, কিন্তু ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা করে না। বাঘ, সাপ আর কুমির থেকে বাঁচতে তাবিজ নিয়ে যাই, কিন্তু ডাকাত থেকে বাঁচার কোনো তাবিজ নেই।”

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি উপকূলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। সেই সুন্দরবন যদি দস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তবে তা শুধু উপকূলের মানুষের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই অশনিসংকেত।”

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, “জেলেদের অপহরণের খবর আমরা পাই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ করা হয় না। অভিযোগ না থাকলে প্রশাসনের ব্যবস্থা নিতে সমস্যা হয়। এ ক্ষেত্রে জেলেদেরও প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে।”

এদিকে ‘বিপদমুক্ত নৌযাত্রা, জানমালের সুরক্ষা’ প্রতিপাদ্যে দেশে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের এ আয়োজন ঘিরে উপকূলবাসীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই কর্মসূচি সুন্দরবনের নদীপথকে কতটা নিরাপদ করতে পারবে?