সুন্দরবনের মধু আহরণ ও প্রাণবৈচিত্র্য: সহাবস্থান নাকি সংকট?

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৪.২ শতাংশ এবং বনভূমির ৪৪ শতাংশ জুড়ে থাকা এই বন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পায়।

প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই বনে রয়েছে শত শত প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। একই সঙ্গে গড়ে উঠেছে বননির্ভর মানুষের এক ঐতিহ্যবাহী জীবন—যেখানে মৌয়াল, বাওয়ালী, জেলে ও বনজীবীরা প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে টিকে আছেন।

সুন্দরবনের মধু বাংলাদেশের একটি বিশেষ প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রতি বছর চৈত্র থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত চলে মধু সংগ্রহ মৌসুম। বন বিভাগের অনুমতি (পাস) নিয়ে সাত থেকে নয়জনের দল বনে প্রবেশ করে।

মৌয়ালদের ভাষায়, “এক ফোঁটা মধুর জন্য একটি মৌমাছিকে প্রায় ৮০টি ফুলে যেতে হয়।” সুন্দরবনের আগুনে মৌমাছি (Apis dorsata) খলিশা ফুল থেকে যে মধু সংগ্রহ করে, তা ‘পদ্মমধু’ নামে পরিচিত—স্বাদ ও গুণে সেরা।

মৌয়ালরা মৌমাছির চলন দেখে চাক খুঁজে বের করেন। ‘ভারী পোকা’—অর্থাৎ মধুভর্তি মৌমাছির উড়ার পথ অনুসরণ করেই তারা চাকের সন্ধান পান।

মৌমাছি শুধু মধু উৎপাদনই করে না, বরং সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্যের অন্যতম চালিকাশক্তি। তারা পরাগায়ণের মাধ্যমে গাছের বংশবিস্তার নিশ্চিত করে।

কেওড়া, বাইন, গরানসহ বিভিন্ন গাছের ফুলের সঙ্গে মৌমাছির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কেওড়া ফল নদীতে পড়ে মাছের খাদ্য হয়, হরিণ খায় বনজ উদ্ভিদ, আর হরিণ বাঘের খাদ্য—এভাবেই একটি জটিল খাদ্যচক্র গড়ে উঠেছে।

প্রথাগত মৌয়ালরা মধু কাটার সময় চাকের একটি অংশ রেখে দেন, যাতে মৌমাছি বেঁচে থাকে। ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি সরিয়ে শুধুমাত্র মধুভর্তি অংশ সংগ্রহ করা হয়।

মৌসুমে মৌয়ালদের পরিবারেও কিছু নিয়ম মানা হয়—যা লোকজ বিশ্বাসের অংশ হলেও প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের নৈতিক সম্পর্ককে নির্দেশ করে।

স্থানীয় বনজীবীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় মৌমাছির আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৌমাছি আগের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে।

যেখানে প্রথাগত পদ্ধতি টেকসই, সেখানে কিছু অসাধু চর্চা তৈরি করছে বড় সংকট। অনেকেই পুরো চাক কেটে ফেলছে, আগুন ব্যবহার করছে, এমনকি গাছের ডাল কেটে দিচ্ছে—যা মৌমাছি ও বন দুটোরই ক্ষতি করছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো মৌসুম শুরুর আগেই মধু চুরি। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চক্রগুলো আগেই বনে ঢুকে ৪০–৫০ শতাংশ মধু সংগ্রহ করে ফেলছে।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, মার্চের মাঝামাঝি থেকেই চুরি করে মধু আহরণ করা হচ্ছে। এতে একেকটি চাক থেকে যেখানে ৫–৭ কেজি মধু পাওয়ার কথা, সেখানে আগাম কাটায় মিলছে মাত্র ৪০০–৫০০ গ্রাম।

ফলে বন বিভাগের রাজস্ব কমছে, একই সঙ্গে মৌসুমে মধুর উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, লোকবল সংকটের কারণে পুরো সুন্দরবন নজরদারিতে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। মাছ ও কাঁকড়া ধরার পাস নিয়ে অনেকেই ছদ্মবেশে বনে ঢুকে মধু চুরি করছে।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের এক কর্মকর্তা বলেন, মধু মৌসুমে নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার অনুমতি সাময়িক বন্ধ করলে চুরি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

মধু আহরণ শুধু একটি পেশা নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু নতুন প্রজন্মের অনেকেই ঐতিহ্যগত জ্ঞান না জানায় ভুল পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ করছে, যা বন ও তাদের নিজের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।