সুন্দরবনের গহীনে বিষের ছড়াছড়ি নদী-খালে বিষ ঢেলে মাছ শিকার, শুকিয়ে পাচার—জড়িত মহাজন, দস্যু ও অসাধু চক্র

নিজস্ব প্রতিবেদক: Farzana Akter Bristy
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন—যে বন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দেশের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে—সেই বনই এখন নানামুখী সংকটে বিপর্যস্ত। জলবায়ুর অভিঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের নির্মম লোভ। বনের গহীনে চলছে বিষ দিয়ে মাছ শিকার, সেই মাছ শুকিয়ে পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুন্দরবনের নদী ও খালে কীটনাশক ছিটিয়ে মাছ ধরার ভয়াবহ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট—মাছ ব্যবসায়ী (কোম্পানি মহাজন), অসাধু বনরক্ষী এবং বনদস্যুদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চক্র।

স্থানীয় সূত্র জানায়, অল্প সময়ে বেশি মাছ ধরার লোভে জেলেদের বিষ ব্যবহারে প্ররোচিত করেন মহাজনেরা। জোয়ারের সময় খালে পানি ঢোকার পর দুই প্রান্তে জাল পেতে ভাটার সময় পানিতে কীটনাশক ঢেলে দেওয়া হয়। এতে মাছ অক্সিজেনের অভাবে দুর্বল হয়ে ভেসে ওঠে।

বন বিভাগ বলছে, এসব বিষ মূলত কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশক—যেমন ক্লোরপাইরিফস ও সাইপারমেথ্রিন। এগুলো পানিতে মিশে শুধু মাছ নয়, পুরো জলজ পরিবেশ ধ্বংস করে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিষে মারা চিংড়ি অনেক সময় বনের ভেতরেই শুকানো হয়। গাছ কেটে অস্থায়ী মাচা তৈরি করে নিচে আগুন জ্বালিয়ে শুঁটকি বানানো হয়। পরে তা বিভিন্ন পথে পাচার হয়ে পৌঁছে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

কয়রা উপজেলার একটি এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, বিষাক্ত চিংড়ি থেকে তৈরি শুঁটকি কেজিপ্রতি প্রায় ১,৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বনজীবী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু সদস্য নিয়মিত ঘুষ নিয়ে অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশের সুযোগ করে দেন। জেলেরা সরাসরি টাকা না দিলেও মহাজনের মাধ্যমে এই লেনদেন হয়।

একাধিক জেলে জানান, আগে যেখানে প্রতি নৌকায় এক হাজার টাকা দিতে হতো, এখন তা বেড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে।

তবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, “অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে অনেকেই মিথ্যা অভিযোগ করছেন।”

২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করা অনেক বনদস্যু আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব দস্যু দল এখন নির্দিষ্ট মহাজনের জেলেদের নিরাপত্তা দেয় এবং অন্য জেলেদের ওপর হামলা চালায়।

জেলেদের ভাষ্য, দস্যুদের চাঁদা পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে ৫ টাকার একটি বিশেষ নম্বরের নোট ব্যবহার করা হয়। এই ‘টোকেন’ থাকলে তারা বনে নিরাপদে থাকতে পারে, না থাকলে অপহরণের ঝুঁকি থাকে।

পরিবেশবিদদের মতে, বিষ দিয়ে মাছ ধরার ফলে শুধু মাছ নয়, পুরো ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষাক্ত পানি গাছের শিকড়ে পৌঁছে গাছের বৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই বিষাক্ত মাছ মানুষের শরীরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এমনকি ক্যানসারের মতো রোগও বাড়তে পারে।

দীর্ঘদিনের জেলেরা বলছেন, আগে যেখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত, এখন তা অনেক কমে গেছে। পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যাও কমছে।

এক জেলের ভাষায়, “পাঁচ-ছয় বছর আগে বনে বিষ ঢোকেনি। এখন মাছও নাই, পাখিও নাই।”

বন বিভাগ বলছে, বিশাল এই বনে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সব জায়গায় নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে দালালচক্রের কারণে সাধারণ জেলেরা সরাসরি সরকারি সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।