সাতক্ষীরা ‌জলাবদ্ধ আশাশুনি: উপকূলের কান্না শুনছে কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ১ বছর আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : “টানা বৃষ্টিতে বাড়িঘর ডুবে গেছে। খাবার পানি নেই, রান্না করতে পারছি না। ঘেরের সব মাছ বেরিয়ে গেছে।”এভাবেই বর্ণনা করলেন আশাশুনি উপজেলার কুল্যা ইউনিয়নের বাসিন্দা আনোয়ারা হোসেন। এ গল্প শুধু তাঁর একার নয়। আশাশুনি উপজেলার হাজারো মানুষ এখন একই দুর্ভোগের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় লোভী মহলের মুনাফাকেন্দ্রিক চিন্তার যোগফলে আশাশুনি পরিণত হয়েছে একটি দুঃসহ জলবদ্ধ অঞ্চলে। ভয়াবহ পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত চিত্রে দেখা যায়, ১১টি ইউনিয়ন কুল্যা, বুধহাটা, দরগাহপুর, কাদাকাটি, শোভনালী, প্রতাপনগর, বড়দল, খাজরা, শ্রীউলা, আনুলিয়া ও আশাশুনি সদর সবই জলমগ্ন। ৪০ হাজারের বেশি পরিবার কমবেশি পানিবন্দি।

হাজার হাজার একর জমির চাষাবাদ ও মাছ চাষ বিপর্যস্ত। বাড়িঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, টিউবওয়েল-সব ডুবে গিয়ে মানুষের মৌলিক চাহিদায় আঘাত হেনেছে। সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কেন এমন পরিস্থিতি? প্রাকৃতিক দুর্যোগ না পরিকল্পনার ব্যর্থতা? প্রথমে মনে হতে পারে, এ শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে স্পষ্ট হয় এটা একেবারে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ।

নদী ও খাল খননের কাজে দীর্ঘসূত্রতার কারনে, বেতনা ও মরিচ্চাপ নদী আশাশুনির প্রাণ। কিন্তু বেতনা নদী খননের কাজ বছরের পর বছর ধরে অসম্পূর্ণ। স্থানীয় অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম জানান, “চাপড়ার কাছে নদীতে নির্মিত বাঁধ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে।” ফলে অতিবৃষ্টির পানি নদীতে না গিয়ে আশেপাশের এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। মৎস্য ঘেরের দখলদারিত্ব ও অপরিকল্পিত নির্মাণের ফলে ঘের মালিকেরা খালের গতিপথে বাঁধ নির্মাণ করে পানির প্রবাহ বন্ধ করে ফেলেছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিত মজুমদার স্বীকার করেন, “ঘের মালিকদের দখলদারিত্ব জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।” অপর দিকে স্লুইসগেট ও কালভার্ট অকেজো হওয়ার কারনে বেশিরভাগ স্লুইসগেট দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন। বৃষ্টির পানি বাইরে যেতে পারছে না।

বহু জায়গায় কালভার্টই নেই। এমনও দেখা গেছে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি সুদুর প্রসারিত না হওয়ায় প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও তদারকি নেই, নেই স্বচ্ছতা। স্থানীয় নাগরিক নেতা ইয়াহিয়া ইকবাল বলেন, “যতদিন পর্যন্ত দুর্নীতি রোধ, সঠিক খনন পরিকল্পনা ও নেটপাটা অপসারণ না হবে, ততদিন এই জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই নেই।”

জীবিকার মুখে দুর্ভিক্ষের ছায়া দেখাদেওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে, আশাশুনির অর্থনীতি মৎস্য চাষ নির্ভর। বর্তমানে শত শত ঘের তলিয়ে গেছে বা বাঁধ ভেঙে মাছ বেরিয়ে গেছে। মালিকরা নেটপাটা টেনে মাছ রক্ষা করতে মরিয়া চেষ্টা করছেন। কৃষি ক্ষেতে একই অবস্থা শত শত একর জমির সবজি ক্ষেত, ধান ক্ষেত ও ফলের বাগান পানিতে তলিয়ে গেছে। পচে গিয়েছে বীজতলা ও লাগানো চারা। মজুরি ভিত্তিক শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে, যাঁদের জীবিকা নির্ভর গৃহস্থালি কাজ, ক্ষেতে খামারে দিনমজুরি কিংবা ঘের পাহারায় তাঁরা এখন সম্পূর্ণ কর্মহীন।

মানুষের মৌলিক অধিকার আজ বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে হচ্ছে। খাবার পানি, নিচু এলাকার শত শত টিউবওয়েল পানিতে ডুবে গেছে। অনেকেই এখন দূরের উঁচু এলাকা থেকে পানি এনে খাচ্ছেন। স্যানিটেশন ব্যবস্থা, অধিকাংশ পরিবারে টয়লেট ডুবে গেছে। খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ বাড়িয়েছে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি। চিকিৎসা ও ওষুধ সংকটে পানিবন্দি এলাকায় শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য বিপদের আশঙ্কা আরও প্রবল।

পরিবহন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বহু রাস্তাঘাট পানির নিচে, যান চলাচল বন্ধ। প্রশাসনের অবস্থান আছে ইচ্ছা, কিন্তু নেই গতি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণা রায় বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আমরা বাঁধ রক্ষায় কাজ করছি।” কিন্তু স্থানীয় মানুষের অভিমত, প্রশাসনের পদক্ষেপ অনেক দেরিতে, এবং তা মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রকল্প চলমান থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নেই স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়। সমাধানের পথ কোথায়? আমরা মনে করি, কমপক্ষে ৫টি জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজন। ১. বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত খনন কাজ বাস্তবায়ন করা, ২. অবৈধ বাঁধ, নেটপাটা, ঘের নির্মাণ বন্ধ ও পুরনো খাল পুনরুদ্ধার। ৩. নতুন কালভার্ট নির্মাণ ও ¯¬ুইসগেট গুলো দ্রুত সংস্কার করা, ৪. দুর্যোগে ক্ষতি গ্রস্তদের জন্য জরুরি ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থ্যা করা। ৫. সুশাসন, জনসম্পৃক্ততা ও দুর্নীতি রোধে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা।

উপসংহারে বলতে পারি, জল নয়, ব্যবস্থা ডুবছে! আশাশুনির জলাবদ্ধতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা প্রকৃতিকে যতটা দোষারোপ করি, প্রকৃত বিপদ তৈরি হয় আমাদের উদাসীনতায়, পরিকল্পনার অভাবে এবং স্বার্থান্ধ উন্নয়নে। এই জলাবদ্ধতা শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয় এটি আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতীক। জল যদি জমেই থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে এই ব্যবস্থার আর প্রয়োজন কী?