
বিশেষ প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা : বিশ্ববাজারে দাপটের সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার মুরারিকাটি গ্রামের মাটির তৈরি দৃষ্টিনন্দন টাইলস। মাটির গুণগত মান আর কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এসব টাইলস এখন শোভা পাচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন দেশের আধুনিক বাসাবাড়িতে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ববাজারের চাহিদায় সাতক্ষীরার মাটি
২০০২ সাল থেকে মুরারিকাটি গ্রামে টাইলস শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে অন্তত ১৩ থেকে ৪৫টি কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। এখানকার টাইলসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর মাটির গুণাগুণ। স্থানীয়দের ভাষায়, এখানকার মাটি ‘মিষ্টি মাটি’ বা ‘সোনার চেয়ে খাঁটি’। এই মাটির বিশেষ গঠন ও বেলে মিশ্রিত বৈশিষ্ট্যের কারণে উৎপাদিত টাইলস বিশ্বমানের।
বিশেষ করে ইতালি, জার্মানি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এই টাইলসের বিপুল চাহিদা রয়েছে। অনেকে কৌতুক করে কলারোয়াকে ‘ইতালির শহর’ বলেও ডাকেন। প্রতি বছর এখান থেকে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাইলস রপ্তানি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকারও বেশি।
ঐতিহ্যের ছোঁয়া ও আধুনিকতা
আধুনিক যন্ত্রপাতির যুগেও মুরারিকাটির পালপাড়ায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। কারিগররা মাটি সংগ্রহ করে বছরের পর বছর স্তূপ করে রাখেন। এরপর পায়ের সাহায্যে কাদা তৈরি করে বিভিন্ন সাঁচে ঢেলে তৈরি করা হয় ফেক্স এ্যাংগুলার, স্কাটিং, স্টেম্প, ফ্লোর টাইলসসহ বিভিন্ন নকশা। এই শিল্পে নারী ও পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
এই শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও কারিগর ও মালিকদের অভিযোগের শেষ নেই। তাদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এই শিল্পের বড় বাধা।
সিন্ডিকেট ও বৈষম্য: উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সরকারি প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা অনেক সময় প্রকৃত কারিগরদের কাছে না পৌঁছে প্রভাবশালী রপ্তানিকারকদের হাতে চলে যায়।
পণ্যের দাম ও উৎপাদন খরচ: শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলেও টাইলসের বাজারমূল্য সেভাবে বাড়েনি। ফলে কারখানা টিকিয়ে রাখাই অনেক উদ্যোক্তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
পরিবেশগত সুরক্ষা: কৃষি বিশেষজ্ঞ কামাল রেজা সতর্ক করেছেন যে, মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ দিয়ে টাইলস তৈরি করায় দীর্ঘমেয়াদে কৃষিজমিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তিনি পরিকল্পিত শিল্পায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
করণীয়
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সাতক্ষীরার উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস জানিয়েছেন, তারা এই শিল্পকে আরও আধুনিক ও টেকসই করতে কারিগরি সহযোগিতা ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা করছেন। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে এবং রপ্তানি আরও বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি ভর্তুকি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সাতক্ষীরার মাটির তৈরি এই টাইলস শিল্প আজ কেবল একটি ব্যবসার নাম নয়, বরং এটি বাংলার ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যথাযথ নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে কলারোয়ার এই শিল্প বিশ্ববাজারে আরও বড় জায়গা করে নিতে পারবে।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com