
সিরাজুল ইসলাম : টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় জেলার আমন বীজতলা, আউশ ধান এবং সবজি ক্ষেত তলিয়ে গিয়ে প্রায় ১৬ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ।
ফসলের ব্যাপক ক্ষতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সাতক্ষীরার তথ্যমতে, গত ৬ আগস্ট পর্যন্ত অতিবৃষ্টিতে জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৪৬ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ধান, রোপা আমনের বীজতলা এবং শাকসবজি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকার বেশি। সদর উপজেলার কৃষকদের ভাষ্যমতে, জলাবদ্ধতার কারণে ধানের চারা রোপণ বিলম্বিত হওয়ায় চলতি মৌসুমে আমন আবাদ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জলাবদ্ধতায় ডুবল পৌরসভা ও উপজেলা পৌরসভার কাটিয়া, ইটাগাছা, মধুমাল্লারডাঙ্গী, বদ্দীপুর কলোনি ও রসুলপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। অনেক এলাকায় বসতবাড়ি ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় মানুষ মাচান বানিয়ে বসবাস করছেন। রান্না বন্ধ থাকায় পানিবন্দী পরিবারগুলো খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়েছে। শহরতলীর মাছখোলা, বিনেরপোতা ও বল্লীসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। কোথাও কোথাও মানুষকে কলাগাছের ভেলায় যাতায়াত করতে দেখা গেছে।
পানি নিষ্কাশনে ধীরগতি ও দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল ও বিলের মুখ অবৈধভাবে দখল করে ঘের তৈরি এবং অপরিকল্পিত স্লুইস গেটের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানি কমিটির নেতা মফিজুর রহমান একে ‘মানবসৃষ্ট দুর্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নদী ও খাল দখলমুক্ত এবং খনন না করলে এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রশাসক মাশরুবা ফেরদাউস জানান, পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে এবং সার্কিট হাউস থেকে বাইপাস পর্যন্ত একটি বড় ড্রেন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহমান তাযকিয়া জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে বেতনা নদীর আড়াআড়ি বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের পথ সুগম করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে। কেবল জোড়াতালির মেরামত নয়, বরং টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করা সম্ভব।
