সাতক্ষীরায় বাণিজ্যিক কলাচাষে বাড়ছে আগ্রহ, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ফিরছে কৃষকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা-এ আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের ব্যবহার বাড়ায় বাণিজ্যিকভাবে কলাচাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকরা। এতে জেলায় কলাচাষের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। দিন দিন বাড়ছে কলাচাষির সংখ্যা, আর এর মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন অনেক বেকার যুবক ও কৃষক পরিবার।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, একসময় যাদের সংসারে অভাব-অনটন ছিল, এখন কলাচাষ তাদের জীবনে এনেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় হাজারো কলাবাগান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৭২১ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে কলা চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ১৫০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৭৫ হেক্টর, তালায় ৭৮ হেক্টর, দেবহাটায় ৮ হেক্টর, কালিগঞ্জে ৩৮০ হেক্টর, আশাশুনিতে ২৫ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৫ হেক্টর জমিতে কলাচাষ হয়েছে। এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৫৯২ মেট্রিক টন।

সদরের ঘুড্ডেরডাঙ্গী গ্রামের কৃষকরা জানান, হাইব্রিড জাতের সাগর কলা চাষ করে তারা লাভবান হচ্ছেন। একই জমিতে অন্য ফসলের তুলনায় কলাচাষে বেশি লাভ পাওয়া যাচ্ছে, ফলে এ ফসলের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। বাজারে চাহিদা ভালো থাকায় দামও স্থিতিশীল রয়েছে।

কৃষক জগনন্দ কুমার জানান, তিনি ৮-১০ বছর ধরে সাগর কলা চাষ করছেন। প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয় প্রায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা, আর বিক্রি হয় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তিনি বলেন, “কলা চাষ এখন আমাদের প্রথম পছন্দ, কারণ এতে ঝুঁকি কম এবং লাভ বেশি।”

একই এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী, আনন্দ, ইবাদুল ও আবুল কাশেম জানান, কলাচাষে শ্রম কম লাগে এবং বিক্রিও তুলনামূলক সহজ। বাজারে দামের বড় ধরনের পতন হয় না, তাই এটি একটি নিরাপদ অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তালা উপজেলার বারুইপাড়ার কৃষক মিলন দাশ বলেন, তার বাগানে বর্তমানে ৪০০টির বেশি কলাগাছ রয়েছে। তার সফলতা দেখে আশপাশের অনেকেই কলাচাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

দেবহাটার কৃষক রমেশ স্বর্ণকার জানান, চিংড়ি চাষের পাশাপাশি কলাচাষ করে তিনি বেশি লাভ পাচ্ছেন। ফলে এলাকাজুড়ে কলাচাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, “সাতক্ষীরার মাটি ও জলবায়ু কলাচাষের জন্য উপযোগী। বিশেষ করে সদর উপজেলার ঘুড্ডেরডাঙ্গী এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে সাগর কলা চাষ ব্যাপকভাবে হচ্ছে। এটি এখন জেলার একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল।”

তিনি আরও বলেন, ধান, পাট ও আখের তুলনায় কলাচাষে শ্রম ও ঝুঁকি কম, তাই কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও কলাচাষীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রওশন আলী জানান, সাতক্ষীরার উৎপাদিত কলার চাহিদা শুধু স্থানীয় নয়, জেলার বাইরেও রয়েছে। ফলে বাজারে এর স্থিতিশীলতা কৃষকদের জন্য আরও সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।

কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কলাচাষ সম্প্রসারণ করা গেলে সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।