
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সময়ের চাকা আরও একবার ঘুরে এল। পুব আকাশে উদিত নতুন সূর্য ধুয়ে-মুছে দিয়েছে ১৪৩২ বঙ্গাব্দের ধূসর স্মৃতি। সাতক্ষীরার রূপসী সীমান্তজুড়ে আজ বইছে নতুন প্রাণের স্পন্দন। কপোতাক্ষ, বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর ঢেউয়ে বাজছে নতুনের জয়গান—“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো”।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে সাতক্ষীরায় দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে পহেলা বৈশাখ। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে নানা আয়োজন।
সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলগ্ন কালেক্টরেট পার্কে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রসংগীত “এসো হে বৈশাখ”। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় আহীর ভৈরব রাগের বাঁশির সুর ভোরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
সকাল সোয়া ৭টায় কালেক্টরেট পার্ক থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য বর্ষবরণ শোভাযাত্রা। ইউনেসকো স্বীকৃত মঙ্গল শোভাযাত্রা-এর আদলে আয়োজিত এ শোভাযাত্রায় ফুটে ওঠে সাতক্ষীরার লোকজ ঐতিহ্য। মাটির সরা চিত্র, বিশালাকার হাতি-ঘোড়া, পুতুলসহ বিভিন্ন প্রতীকী উপস্থাপনায় শহরের রাজপথ পরিণত হয় এক শিল্পমঞ্চে।
শোভাযাত্রায় অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পুরুষদের পরনে পাঞ্জাবি-পায়জামা ও লুঙ্গি, নারীদের লাল-সাদা শাড়ি এবং শিশুদের মাথায় জাতীয় পতাকার ব্যান্ড ও হাতে একতারা ছিল চোখে পড়ার মতো। শোভাযাত্রাটি শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে গিয়ে শেষ হয়।
সেখানে শুরু হয় সাত দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। মেলায় সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী পণ্য, মাটির তৈজসপত্র, নকশিকাঁথা, বাঁশ-বেতের সামগ্রী এবং দেশীয় খাবারের পসরা বসেছে। ভাঁপা, পুলি ও তিলের পিঠার গন্ধে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
বিকেলে সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ঘুড়ি উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা। আকাশে রঙিন ঘুড়ির উড়াউড়ি আর লাঠিয়ালদের কসরতে মুখর হয়ে ওঠে মাঠ প্রাঙ্গণ। একইসঙ্গে ঢোলের তালে তালে চলে লাঠি খেলার প্রদর্শনী, যা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি করে।
বিকেল ৫টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় বাউল, ভাটিয়ালি ও গণসংগীত। কবিতা আবৃত্তিতে উঠে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশের বৈশাখী ভাবনা। অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
সাতক্ষীরা জেলা শিশু একাডেমি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে দিনব্যাপী চলে চিত্রাঙ্কন, কুইজ ও বৈশাখী আড্ডা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও “শুভ নববর্ষ” বার্তায় মুখর ছিল জেলার ডিজিটাল জগৎ।
এদিকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সদর হাসপাতাল, কেন্দ্রীয় কারাগার ও এতিমখানায় পরিবেশন করা হয় বিশেষ বাঙালি খাবার। বন্দি ও রোগীদের মধ্যেও দেখা যায় উৎসবের ছোঁয়া।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “উৎসব সবার জন্য—এই ধারণা থেকেই আমরা সমাজের প্রতিটি স্তরে নববর্ষের আনন্দ পৌঁছে দিতে চেষ্টা করেছি।”
সাতক্ষীরার ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘হালখাতা’র ঐতিহ্যও এবার নতুনভাবে উদযাপিত হয়। নতুন খাতা খোলা, পুরনো দেনা পরিশোধ এবং মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
স্থানীয়দের মতে, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জীবিকার চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পহেলা বৈশাখ তাদের নতুন স্বপ্ন দেখায়। এক প্রবীণ শিক্ষক বলেন, “আমরা চাই নদীগুলো বাঁচুক, সুন্দরবন রক্ষা পাক, আর আমাদের সন্তানরা একটি প্রগতিশীল সমাজে বড় হোক।”
সাতক্ষীরা যেন আজ নতুন স্বপ্নে জেগেছে। “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা”—এই কবিগুরুর পঙক্তি যেন পুরো দিনের মূল সুর হয়ে ধ্বনিত হয়েছে সর্বত্র।
দিন শেষে উৎসব থেমে গেলেও সাতক্ষীরার মানুষের মনে রয়ে গেছে নতুন বছরের আশার আলো। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই যাত্রা হোক শান্তি, প্রগতি ও সম্প্রীতির পথে—এই প্রত্যাশাই এখন জেলার প্রতিটি মানুষের কণ্ঠে।
