
নিজস্ব প্রতিবেদক : সকাল ছয়টা থেকে বিকেল পর্যন্ত পাথর ভাঙেন ছামিরুন (৪৮)। দিন শেষে মজুরি পান ৩২০ টাকা। এই আয়ে দুই সন্তানের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁর। কোনো দিন কাজ না থাকলে অনাহারেই কাটে দিন।
“সমান কাজ করি, কিন্তু মজুরি কম। না করলে খামু কী?”—বলছিলেন তিনি।
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও শেরপুরের নালিতাবাড়ী—দুই উপজেলার নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে এমন গল্পই বেশি শোনা যায়। অভাবের তাড়নায় কৃষি ও শ্রমঘন কাজে যুক্ত হচ্ছেন নারীরা। কিন্তু সমান পরিশ্রম করেও পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক মজুরি পাচ্ছেন তারা।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা। এখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দিন এনে দিন খায়। পুরুষরা রিকশা-ভ্যান চালানো, কৃষিকাজ বা ঢাকায় গিয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে একার আয়ে সংসার না চলায় নারীরাও নেমে পড়েছেন মাঠে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার নারী মরিচ তোলা, ভুট্টা তোলা, ধান কাটা, আখ কাটা ও নিড়ানির কাজ করছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরুষ শ্রমিকেরা দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি পেলেও নারী শ্রমিকদের দেওয়া হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
পূর্ব কাজলাপাড়া আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা মোমেনা বেগমও তাঁদের একজন। স্বামী দিলদার আলী কখনও রিকশা চালান, কখনও দিনমজুরি করেন। কিন্তু নিয়মিত কাজ জোটে না। তাই সংসারের হাল ধরতে মাঠে নামতে হয়েছে মোমেনাকে।
তিনি বলেন, “অনেকে বলে—মেয়ে মানুষ হয়ে মাঠে কাজ করি। কিন্তু কাজ না করলে খাব কী?”
এই গ্রামে প্রায় ৬০টি ভূমিহীন পরিবার বসবাস করে। প্রায় তিন দশক আগে বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে এখানে বসতি গড়েন তারা। কাজ থাকলে খাবার জোটে, না থাকলে উপোস। সরকারি সহায়তা বলতে বছরে দুই ঈদে সামান্য চাল।
মধ্যেরচরের আজিরন বেগম বলেন, “আমরা পুরুষদের সমান কাজ করি, কিন্তু অর্ধেক মজুরি পাই। নারী বলেই এই বৈষম্য। আমাদের সমান মজুরি দরকার।”
অন্যদিকে, নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরেও একই চিত্র। এখানে পাথর ভাঙা ও ওঠানামার কাজে বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক যুক্ত আছেন, যাদের বড় একটি অংশ নারী। নিয়মিত পাথর ও কয়লা আমদানি না হওয়ায় কাজ কমে গেছে। ফলে কম মজুরিতেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন শ্রমিকরা।
স্থানীয় শ্রমিক ছামিরুন বলেন, “এই টাকা দিয়ে সংসার চলে না। খরচ বাড়ছে, আয় বাড়ে না। ধারদেনা করে চলতে হয়।”
শ্রমিকেরা জানান, পাথর ভাঙার ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গরমের মধ্যে মাস্ক, গ্লাভস বা চশমা ব্যবহার করাও অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। অসুস্থ হলে স্থানীয় হাতুড়ে চিকিৎসকের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
বাতকুচি এলাকার আঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, “৩২০ টাকা দিয়ে বাজারে গেলে কিছুই থাকে না। কোনোভাবে দিন চলে।”
তবে শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুজন মিয়া বলেন, তাঁদের সমিতির পক্ষ থেকে অসুস্থ বা আহত শ্রমিকদের কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। কোনো শ্রমিক মারা গেলে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে সহায়তা করা হয়। মহান মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিকদের জন্য আনন্দ ভ্রমণেরও আয়োজন করা হয়েছে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. জহুরুল হোসেন বলেন, “এলাকাটি কৃষিনির্ভর। প্রয়োজনের তাগিদে নারীরা কাজ করছেন। মজুরি বৈষম্য দূর করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। উপজেলা পর্যায়ের প্রকল্পগুলোতে নারী শ্রমিকদের সমান মজুরি নিশ্চিত করা হচ্ছে।”
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এখনো সমান কাজের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। তাঁদের দাবি, শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন ও সমান মজুরি নিশ্চিত করা হোক।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com