
নাজমুল হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক : লক্ষ্মীপুর জেলার সদর থেকে কমলনগর হয়ে রামগতি, সদর থেকে চন্দ্রগঞ্জ, আর সদর হয়ে রামগঞ্জ ও রায়পুর পরে চাঁদপুর — সব পথেই এক দৃশ্য: সড়কে গর্ত, খানাখন্দ, আর ধুলার রাজত্ব। বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা, শুকনো হলে ধুলোর ঝড়। আর এইসব রাস্তায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ পাড়ি দেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া এসব সড়কে দেখা গেছে বড় বড় গর্ত, কোথাও পিচ উঠে গিয়ে কাঁচা মাটি বেরিয়ে এসেছে। পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, শুধু গাড়ি নষ্ট হওয়া নয় — দুর্ঘটনায় মানুষও প্রাণ হারাচ্ছে।
দুর্ভোগের আরেক নাম লক্ষ্মীপুরের রাস্তা জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি হলো লক্ষ্মীপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক। অন্য দিকে লক্ষ্মীপুর-চন্দ্রগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক এই রুটে প্রতিদিন অসংখ্য বাস, ট্রাক, অটো, সিএনজি চলাচল করে। অন্য দিকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। কিন্তু সড়কের অবস্থায় মনে হয়, দেখার কেউ নেই।
রায়পুর উপজেলার এক অটোচালক নুরুল হক বলেন, “দুই সপ্তাহ আগে আমার অটো গর্তে পড়ে উল্টে যায়। যাত্রী আহত হন। প্রায়ই এমন হচ্ছে। কোনো মেরামত হয় না।”
কমলনগরের গৃহবধূ সালমা আক্তার বলেন, “বাচ্চাকে স্কুলে নিতে গিয়ে রাস্তায় জ্যামে ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকি। রাস্তায় ধুলো, গর্ত, সব মিলিয়ে কষ্টের শেষ নেই। তবে হাজির হাট এলাকায় একবার জ্যাম হলে মনে হয় ঢাকার মগবাজারে আছি।”
সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী বলেন, “সংস্কারের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ এলে কাজ শুরু হবে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ বলছেন, প্রকল্প আসে, টেন্ডার হয়, কিন্তু কাজ হয় না ঠিকঠাক। নজরদারি না থাকায় ঠিকাদাররা কাজ শেষ না করেই চলে যান।
বিশ্লেষক ও স্থানীয় উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই এই জেলার উন্নয়নের চাবিকাঠি। লক্ষ্মীপুর মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল। প্রতি বছর লক্ষ্মীপুর থেকে বিপুল পরিমাণ সুপারি, ইলিশ, চিংড়ি, ধান ও সবজি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
লক্ষ্মীপুর থেকে রায়পুর, রামগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলা এবং জেলার বাইরে যাতায়াত করে হাজারো মানুষ। বিশেষ করে বাগবাড়ি থেকে রামগঞ্জ সড়কে খানাখন্দ বেশি হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা সড়ক উপবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রায়পুর বোর্ডার বাজার থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নে টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। বাগবাড়ি থেকে জুড় কবর পর্যন্ত কার্যাদেশও প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া বাগবাড়ি থেকে গৌরীপুর পর্যন্ত সড়কটিকে জেলা মহাসড়ক থেকে আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীত করা হয়েছে।
রামগঞ্জ উপবিভাগী প্রকৌশলী মো. আমীর হোসেন বলেন, “১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কটিকে ৩৪ ফুটে উন্নীত করার জন্য ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফাইল (ডিপিপি) প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। দ্রুতই প্রয়োজনীয় কাজ শুরু হবে।”
এদিকে, সড়কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। রিকশা চালক হানিফ মিয়া বলেন, “এই খানাখন্দের মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন রিকশা চালাই। অনেক সময় যাত্রীরা পড়ে যায়। কিন্তু সংস্কারের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।”
স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই যেন জরুরি ভিত্তিতে সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করা হয়।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, “যদি সড়ক উন্নত হয়, তাহলে কৃষকরা আরও সহজে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। উৎপাদনও বাড়বে।”
একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “ঢাকা-লক্ষ্মীপুর সড়ক চার লেনে উন্নীত করলে এখানে শিল্প স্থাপন বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে।”
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সড়কটির সংস্কারের প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বাজেট এলেই কাজ শুরু হবে।’
সরকারি পরিকল্পনায় রয়েছে লক্ষ্মীপুরকে ঘিরে নতুন নদীবন্দর, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন, ট্যুরিজম স্পট উন্নয়ন — কিন্তু যেসব সড়ক দিয়ে বিনিয়োগ আসবে, সেই সড়কই চলার উপযোগী না হলে পরিকল্পনা কাগজেই থাকবে।
