
সিরাজুল ইসলাম : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের মাদিয়া এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর তীরঘেঁষে দাঁড়িয়ে চরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ফজর আলী। গত কয়েক দিনে চোখের সামনে নদীর চরের একটা বড় অংশ ধসে তলিয়ে গেছে নদীগর্ভে। ভাঙনের তীব্রতা দেখে তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ।
ফজর আলী বললেন, “বুধবার ভোরে প্রথম দেখ্লাম চরের ৫০-৬০ ফুট জায়গা ডেবে গেছে। এরপর থেইকা ভাঙন থামতিছে না। বাঁধডা ভাইঙ্গা গেলি আমাগের আর কিচ্ছু অবশিষ্ট থাকবে না।”
ফজর আলীর এই আশঙ্কাই এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে খোলপেটুয়া নদীর তীরবর্তী ১০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষকে। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাদিয়া এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর প্রায় ২৫০ ফুট চর হঠাৎ ধসে যাওয়ায় তীব্র ভাঙন-আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারানোর শঙ্কায় চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় অন্তত ৩০০ পরিবার।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো মুহূর্তে খোলপেটুয়ার মূল বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদিয়া এলাকার দুর্গাবাটি মন্দিরসংলগ্ন নদীর চরে হঠাৎ করেই এই তীব্র ধস শুরু হয়। প্রথম দিকে ভাঙনের পরিধি কম থাকলেও জোয়ারের পানির চাপ ও তীব্র স্রোতের কারণে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যে প্রায় ২৫০ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এর ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে নদীর লাগোয়া পশ্চিম দুর্গাবাটি, পূর্ব দুর্গাবাটি, মাদিয়া, আড়পাঙ্গাশিয়া, বড়কুপট, ছোটকুপট, পশ্চিম পোড়াকাটলা, পূর্ব পোড়াকাটলা, ভামিয়া এবং কল বাড়ির আংশিক এলাকা।
মাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় বিএনপি নেতা রুস্তম আলী বলেন, “খোলপেটুয়া নদীর এই বেড়িবাঁধ অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি এই বাঁধ কোনোভাবে ভেঙে যায়, তবে ৮ থেকে ১০টি গ্রাম মুহূর্তের মধ্যে নোনা পানিতে প্লাবিত হবে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হবে, ফসলি জমি আর শত শত মাছের ঘের ভেসে যাবে।”
উপকূলীয় এই অঞ্চলে নদীভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। আইলা, আম্পান কিংবা ইয়াসের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন এখানকার মানুষ। ভাঙন শুরু হলেই জোড়াতালির মেরামত কাজ চললেও স্থায়ী কোনো সমাধান মেলে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য নীলকান্ত রপ্তান বলেন, “দুর্গাবাটি মন্দির সংলগ্ন মাদিয়া এলাকায় যেভাবে নদীর চরে ধস নেমেছে, তা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এটি ভেতরের মাটির স্তরের দুর্বলতার লক্ষণ। এখনই যদি বড় ধরনের স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে নোনা পানির গ্রাসে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। আমরা আর কতকাল এই আতঙ্কের মধ্যে বাঁচব?”
একই সুর শোনা গেল স্থানীয় বাসিন্দা মহিয়ার রহমান ও আয়জান বেগমের কণ্ঠেও।
তাঁরা বলেন, জোয়ারের সময় নদীর পানি যখন বেড়িবাঁধের কাছাকাছি চলে আসে, তখন ঘরের ভেতর রাতে ঘুমানো যায় না। কখন বাঁধ ভেঙে পানি ঘরে ঢুকে পড়ে, এই ভয়েই রাত পার করতে হয়।
জোড়াতালির চেষ্টা পানি উন্নয়ন বোর্ডের
নদীর চরে তীব্র ধস ও ভাঙনের খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি তৎপরতা শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ভাঙনকবলিত স্থানে ভাঙনরোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তবে নদীর প্রবল স্রোত এবং প্রতিদিনের জোয়ার-ভাটার তীব্রতায় এই সাময়িক ব্যবস্থা কতটা টিকবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান আহম্মেদ বলেন, “মাদিয়া এলাকায় চরের ভাঙন দেখা দেওয়ার পরপরই আমরা জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছি। ভাঙন যাতে মূল বেড়িবাঁধ স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্য ওই স্থানে জিও বস্তা ডাম্পিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি এবং ভাঙন ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।”
তবে স্থানীয় টেকসই উন্নয়ন কর্মীদের মতে, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক সান্ত্বনা দেওয়ার চেয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সিসি ব্লক বা টেকসই স্থায়ী রিং-বাঁধ নির্মাণ করা না হলে শ্যামনগরের এই সীমান্ত অঞ্চলকে মানচিত্র থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com