লবণাক্ত জমিতে সবুজ সাফল্য: সাতক্ষীরায় সবজি চাষে ভাগ্য বদলেছে শত পরিবারের

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : একসময় লবণাক্ততার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় অনাবাদি পড়ে থাকত সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার হাটছালা গ্রামের জমি। বর্ষা মৌসুমে সামান্য ধান উৎপাদন ছাড়া কৃষির আর কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। জীবিকার জন্য দিনমজুরিই ছিল গ্রামবাসীর ভরসা। কিন্তু সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন সারা বছর সবুজে ভরে থাকে হাটছালা গ্রাম। শাক–সবজি চাষ করে স্বচ্ছলতা ফিরেছে অন্তত ১০০ পরিবারের জীবনে।

শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে হাটছালা গ্রামে ২৫ হেক্টর জমিতে উচ্ছে চাষ হয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মণ উচ্ছে বাজারজাত হচ্ছে। কেজিপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় প্রতিদিন এ গ্রাম থেকেই প্রায় পাঁচ লাখ টাকার উচ্ছে বিক্রি হচ্ছে। হাটছালার সাফল্য দেখে পাশের গোবিন্দপুর ও শংকরকাটি গ্রামেও উচ্ছে চাষ বাড়ছে।

হাটছালা গ্রামের কৃষক বিশ্বজিৎ গায়েন বলেন, ‘তিন বিঘা জমিতে উচ্ছে চাষ করেছি। প্রতিদিন ২০০–২৫০ কেজি বিক্রি হচ্ছে। মৌসুম শেষে প্রায় এক লাখ টাকা আয় হবে।’
স্থানীয় নকিপুর, বালিয়াডাঙ্গা ও মৌতলা বাজারে এসব সবজি বিক্রি হয়। সেখান থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।

প্রচণ্ড লবণাক্ততার মধ্যেও প্রায় ৩০ বছর আগে হাটছালায় সবজি চাষ শুরু করেন মনোতোষ মণ্ডল (৬০)। একসময় ফেরি করে শাঁখা–পলা বিক্রি করতেন তিনি। সংসারের প্রয়োজনে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ শুরু করেন। ধীরে ধীরে পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, উঁচু ‘ভিটা’ তৈরি করে বারোমাসি সবজি চাষে সফল হন।

মনোতোষ মণ্ডল বলেন, ‘সবজি চাষে জমি কম লাগে, খরচও তুলনামূলক কম। নিয়মিত যত্ন নিলে অল্প সময়েই ফল পাওয়া যায়।’
এখন তিনি ৮০ শতাংশ জমির মালিক। তাঁর দেখানো পথে হেঁটে হাটছালা ছাড়াও দেওল ও শংকরকাটি গ্রামের কয়েক শ পরিবার সবজি চাষে যুক্ত হয়েছে।

কৃষক অনুরুপা মণ্ডল জানান, আগে নারীরা মাঠে কাজ করতেন না। এখন পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সবজি চাষে যুক্ত। ফলে সারা বছর উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
অনুপ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘নারীরা ক্ষেত সামলানোর পাশাপাশি সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনা করেন। পুরুষরা ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাত করেন।’

শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘হাটছালা গ্রামে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।’ তিনি জানান, উচ্ছে ছাড়াও এখানে লবণসহনশীল আলু ও নানা দেশি সবজি চাষ হচ্ছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তবে বড় সমস্যা সেচের পানির সংকট। বৃষ্টির পানিই প্রধান ভরসা। অনেক সময় পাশের গ্রাম থেকে বেশি দামে পানি কিনে সেচ দিতে হয়। কৃষকদের মতে, সেচের স্থায়ী ব্যবস্থা হলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।

একসময় যে গ্রামে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, সেই হাটছালাই এখন সবজি চাষের উদাহরণ। লবণাক্ত জমিতেও যে সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রমে কৃষিতে সাফল্য সম্ভব—হাটছালা গ্রাম তারই প্রমাণ।