
সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।এক সময়ের চিরচেনা দৃশ্য ছিল পান্তা ভাতের সঙ্গে পুঁটি মাছের পদ। গ্রামের হাটে কিংবা শহরের অলিগলিতে সহজলভ্য এই মাছটি আজ কেবল স্মৃতিচারণে স্থান পাচ্ছে। একসময় মানুষ গর্ব করে বলত- ‘পুঁটি মাছের কাঙালি, ভাত মাছের বাঙালি।’ এখন সেই প্রবাদ বাক্যই যেন পরিণত হয়েছে ঐতিহ্য হারানোর এক নিঃশব্দ বেদনায়!
বাঙালির পরিচয় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত দেশীয় মাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। কালের বিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস, অপরিকল্পিত চাষাবাদ ও আধুনিক কৃষির রসায়ননির্ভর নীতির ফলে মাটির সঙ্গে যেমন সম্পর্ক হারাচ্ছে বাঙালি, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জলাশয় ও তার আশ্রিত প্রাণবৈচিত্র্য।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ও সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এক সময় উপকূলীয় অঞ্চলে আড়াই শতাধিক প্রজাতির মিঠা পানির মাছ পাওয়া যেত। আজ সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ভয়াবহ রকমের কম পর্যায়ে। বর্তমানে ৫৪টি প্রজাতি বিলুপ্ত এবং ২৮টি চরম বিপন্ন তালিকায় অবস্থান করছে। শোল, টাকি, কৈ, মাগুর, শিং, চিতল, চ্যাং, পাবদা, খয়রা, পুঁটি, গজাল, মোরকৌল্লো, ভোলা, বাশপাতা, কালিবাউশ, কুইচ্যা, গোদা চিংড়ি-এসব মাছ এখন গ্রামাঞ্চলের শিশুরা বইয়ের পাতায় পড়ে, বাস্তবে দেখে না!
এমন সঙ্কট সৃষ্টির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। খাল-বিল ও নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে, জলাশয়ে পলি পড়ে গভীরতা হারাচ্ছে, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাছের জন্য হয়ে উঠেছে মারাত্মক বিষ। বর্ষা মৌসুমে মাছ যখন ডিম ছাড়ে, তখন বিভিন্ন ধরনের অবৈধ জাল দিয়ে ডিমওয়ালা মা মাছ ধরা হয়। এতে মাছের প্রজননব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। নদী ও খালে ডিম ফুটে বের হওয়া রেনু মাছও বাঁচতে পারে না কারেন্ট জালের মারপ্যাঁচে। তাছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলে এখনও বিষ প্রয়োগ ও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরার মতো অপরাধ সংগঠিত হয়।
এছাড়া প্রজননের মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ধরা, ডিম ফোটার আগেই রেনু মাছ নিধন এবং অবৈধভাবে মাছ ধরা (বিষ প্রয়োগ, বৈদ্যুতিক শক) দেশীয় প্রজাতিগুলোর টিকে থাকা আরও কঠিন করে তুলছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ও সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘শুধু অবৈধ জাল নয়, কৃষি জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নদী বা খালে এসে মাছের জীবননাশ ডেকে আনে। কলকারখানার বর্জ্য নদী ও জলাশয়ে নেমে গিয়ে মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। অনেক জায়গায় দেখা যায়, ফসলের জমিতে কীটনাশকের প্রভাবে মাছ মরে গিয়ে জমিই ভরে যায়। সেই জমির ধান মানুষের পেটে যায়, পরোক্ষে মানুষের স্বাস্থ্যেও আসে নেতিবাচক প্রভাব।’
সিডিও নামক একটি স্থানীয় পরিবেশ সংগঠনের পরিচালক আল ইমরান বলেন, ‘আইলার পর সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ উপকূলে লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এই লবণাক্ত পানি এখন মাছ চাষের ঘেরগুলোতে তোলা হয়। ফলে মিঠা পানির মাছ বেঁচে থাকতে পারে না। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ধরা পড়ায় বংশবৃদ্ধি থেমে যাচ্ছে, প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র ভেঙে পড়ছে।’
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ১৩৬টি খাল এক সময় স্থানীয় মাছের অভয়াশ্রম ছিল। বর্তমানে অধিকাংশ খাল দখল হয়ে গেছে অথবা ঘেরে নোনা পানি তুলার ফলে মিঠা পানির মাছ টিকে থাকতে পারছে না। বর্ষা মৌসুমে মা মাছ প্রাকৃতিক জলাশয়ে ডিম ছাড়ার জন্য আসলেও অপরিকল্পিত বাঁধ এবং পানিপ্রবাহে বাধার কারণে তারা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
মৎস্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাছের স্বাভাবিক প্রজননের জন্য ‘রেস্টোরেশন পিরিয়ড’ বা তিন মাসের অবসর সময় আবশ্যক। সরকার এই সময় নদী ও জলাশয়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারি বন সংরক্ষক মশিউর রহমান এই প্রতিবেদককে জানান, ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষায় সরকার তিন মাসের জন্য মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে এ সময়ও অনেকে তা মানছে না। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে আন্তর্জাতিক জলযান চলাচলের ফলে শব্দ ও কৃত্রিম আলো মাছ ও জলজ প্রাণিদের প্রজনন ও জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়। বন বিভাগ মাছ শিকার নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, তবে বাস্তবায়নে রয়েছে সীমাবদ্ধতা।’
তিনি আরও জানান, মাছের বিশ্রামকালীন সময় তিন মাস নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যা গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
মাছে ভাতে বাঙালির সেই ঐতিহ্য আজ শুধুই গল্প। খাবারের টেবিলে দেশীয় মাছের জায়গা দখল করেছে বিদেশি প্রজাতির রুই, কাতলা কিংবা তেলাপিয়া, যেগুলোর স্বাদ কিংবা পুষ্টিগুণ প্রাকৃতিক দেশীয় মাছের ধারেকাছেও নয়।
পুষ্টির দিক থেকেও এর ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে বিভিন্ন গবেষণায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশনের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মাছ চাষ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারের ৬০ শতাংশ নারী ও শিশু আয়রন ও আয়োডিন ঘাটতিতে ভুগছে। সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন বলেন, আমিষের অভাবে গ্রামীণ নারীরা ভিটামিন এ, ডি ও সি ঘাটতিজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শিশুদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে রাতকানা, ত্বকের রোগ, দাঁতের সমস্যা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসসহ নানা পুষ্টিগত সংকট।
সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন বলছিলেন, ’আমিষের অভাবে নারীরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে। ভিটামিন এ-এর অভাবে রাতকানা, ভিটামিন সি-এর অভাবে স্কার্ভি ও দাঁতের সমস্যা বাড়ছে। শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।’
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সর্বস্তরের সচেতনতা ও কার্যকরী উদ্যোগ। শুধু সরকার নয়, স্থানীয় জনগণ, জেলে সমাজ, পরিবেশকর্মী এবং মৎস্যজীবীদের নিয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া দেশীয় মাছ রক্ষা সম্ভব নয়। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চললেও পরিবেশের ভারসাম্য না থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও পরিবেশবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী দেশীয় মাছ রক্ষায় মাছের প্রজনন মৌসুমে অভয়াশ্রম নিশ্চিত করা জরুরী। কারেন্ট জালসহ ক্ষতিকর সব ধরনের জাল নিষিদ্ধ ও মনিটরিং জোরদার, পুকুর-ঘেরে নোনা পানি তোলা বন্ধ, কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সবার আগে। তবে অবশ্যই জেলেদের জন্য বিকল্প পেশার সুযোগ সৃষ্টি করার পরামর্শও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অথচ সেই নদী এখন প্রায় মাছশূন্য! মাছে-ভাতে বাঙালির পরিচয় শুধু বইয়ের পাতায় থাকলে চলবে না, বাস্তবেও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবেই না, পুঁটি মাছ কেমন দেখতে ছিল, কীভাবে গ্রামবাংলার খালে-বিলে-জলাধারে ছোট মাছগুলো লাফিয়ে বেড়াত!
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com