
নোয়াখালী প্রতিনিধি | লন্ডনের ব্যস্ত নগরজীবন। চারদিকে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষা। কিন্তু এর ভেতরেই কোনো কোনো আবাসে কান পাতলে শোনা যায় চিরচেনা বাংলা ভাষা, ভাতের গন্ধে ম ম করে চারপাশ। ঠিক যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা ৪৩ সদস্যের রহমান পরিবারটি যেন সেই চিত্রেরই এক অনন্য উদাহরণ।
ফেনীর দাগনভূঞা ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের শেকড়ে বেড়ে ওঠা গোলাম রহমান ওরফে রহমান সাহেব—যাঁর হাত ধরে আজকের এই বিশাল পরিবারের গোড়াপত্তন। ১৯৫৫ সালে যখন লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটি ছিল খুবই ছোট, তখন অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। সেই সংগ্রাম আর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত আজ তাঁর বংশধরদের দিয়েছে এক সাফল্যের ঠিকানা।
যেভাবে গড়ে উঠল এই পরিবার ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভের পর রহমান সাহেব পরিবারের ভাগ্যবদলের স্বপ্ন দেখেন। ২০০৪ সালে তাঁর মেজো ছেলে গোলাম মাহমুদ ও ছোট ছেলে আব্দুল কুদ্দুছ সুমন লন্ডনে পাড়ি জমান। এরপর ২০০৬ সালে চার বোন আশ্রাফের নেছা রুবি, শামসুর নাহার মিনা, নূর নাহার রিনা ও নূরজাহান রুনা যোগ দেন তাঁদের সঙ্গে।
আজ লন্ডনের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও, এই ৪৩ জনের বিশাল পরিবারটি একটি সুতোয় গাঁথা। বর্তমানে পরিবারের ৩৮ জনই ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। কেউ উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী, কেউবা সফল ব্যবসায়ী। অথচ বিদেশের চাকচিক্য তাঁদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
স্মরণে ও কর্মে রহমান সাহেব লন্ডনে কঠোর পরিশ্রম করলেও দেশের মাটির টান কখনো ভোলেননি রহমান সাহেব। ১৯৬৯ সালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বিরাহীমপুর গ্রামে নতুন বসতি গড়ার পর তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন জনকল্যাণে। বিরাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং রহমানিয়া জামে মসজিদের জন্য মোট ১২৯ ডিসমিল জমি দান করে তিনি রেখে গেছেন মানবিকতার স্বাক্ষর। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন পরিবারের মেরুদণ্ড।
প্রবাসে দেশীয় ঐতিহ্য চর্চা পরিবারটির সদস্য আশ্রাফের নেছা রুবি বলেন, ‘বাবা সবসময় চাইতেন আমরা যেন এক থাকি। বিদেশে থেকেও আমরা সেই পারিবারিক বন্ধন ও ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। বাবার ত্যাগই আজ আমাদের এই অবস্থানের মূল শক্তি।’
লন্ডনে থাকলেও তাদের প্রতিটি উৎসবে, বিয়েতে বা ছুটির দিনে বাঙালির চিরচেনা মিলনমেলা বসে। সেখানে পিঠা-পুলি, বিরিয়ানি আর বাংলা ভাষায় আড্ডায় মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিটি ঘর। নতুন প্রজন্মের অনেকেই সেখানে জন্ম নিলেও তাদের রক্তে বইছে বাংলা সংস্কৃতির ধারা। নূরজাহান রুনা বলেন, ‘আমরা নতুন প্রজন্মকে বাংলা শেখাই, যাতে তারা শেকড় না ভুলে যায়।’
প্রেরণার নাম ব্যস্ত প্রবাস জীবনের ফাঁকেও পরিবারটি নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজে অবদান রেখে চলেছে। বার ট্রেনিং কোর্সের শিক্ষানবিশ আইনজীবী কাজী ইমদাদুল হক তানিম বলেন, ‘দেশের প্রতি টান আর পারিবারিক ঐক্যের এই দৃষ্টান্ত অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণার। বিদেশের মাটিতে থেকেও তারা যেভাবে নিজেদের সংস্কৃতি ও বন্ধন টিকিয়ে রেখেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
রহমান সাহেবের পরিবার যেন প্রমাণ করে দিয়েছে, দূরত্ব বা নাগরিকত্ব বদলালেও শেকড়ের টান আর ভালোবাসার বন্ধনে এক টুকরো বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব যেকোনো প্রান্তেই।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com