
নাজমুল হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক : লক্ষ্মীপুর আজ হানাদারমুক্ত দিবস পালন করছে। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সর্বশেষ ঘাঁটি দখল করে জেলা হানাদারমুক্ত হয়। ওই দিন ভোরে লক্ষ্মীপুর শহরের বাগবাড়িস্থ মিলিশিয়া ক্যাম্পে ত্রিমুখী আক্রমণ চালায় মুক্তিযোদ্ধারা। প্রবল গুলিবর্ষণের মুখে দুই শতাধিক রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। এর আগেই পাক সেনারা ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়ে যায়।
এই আক্রমণে নেতৃত্ব দেন মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হায়দার চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান এবং সুবেদার আব্দুল মতিনের নেতৃত্বাধীন তিনটি গ্রুপ। মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণে বাগবাড়ি ঘাঁটি দখলে নেওয়া হয়, যা লক্ষ্মীপুরের মুক্তিযুদ্ধে শেষ প্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে লক্ষ্মীপুরে পাকবাহিনীর সঙ্গে ৩৭টি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধারা। জেলার বিভিন্ন স্থানে ১৯টি সম্মুখযুদ্ধ এবং ২৯টি গেরিলা অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব যুদ্ধে জেলার ১১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। লক্ষ্মীপুর–বেগমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর–রামগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুর–রামগতি সড়কের বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় যুদ্ধ হয়। হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়।
প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষ্যে জানা যায়, বাগবাড়ির বিশাল সারের গুদামটি ছিল মিলিশিয়াদের প্রধান ঘাঁটি ও টর্চার সেল। মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় মানুষকে ধরে এনে সেখানে নির্মম নির্যাতন করা হতো। পরে তাঁদের মাদাম ব্রিজের ওপর থেকে গুলি করে খালে ফেলে দেওয়া হতো। মুক্তিযোদ্ধারা পরবর্তী সময়ে ব্রিজটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেন। এ ছাড়া বাগবাড়ি, দালালবাজার, প্রতাপগঞ্জ হাইস্কুল, রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসা, চরমণিগঞ্জ, আলেকজান্ডারসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের ক্যাম্প ছিল। এসব স্থানে গণহত্যা ও অত্যাচারের স্মৃতি আজও বহমান।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, কমান্ডার রফিকুল ইসলাম মাস্টারের নেতৃত্বে ১ ডিসেম্বর থেকেই বাগবাড়ি ক্যাম্প ঘেরাও শুরু হয়। তিন দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর ৪ ডিসেম্বর ভোরে দুই শতাধিক রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হালিম বাসুসহ অনেকেই যুদ্ধে শহীদ হন।
জেলায় শহীদ হওয়া ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম সরকারি তালিকায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মনসুর আহমেদ, রবীন্দ্র কুমার সাহা, আলী আজম, জয়নাল আবেদিন, আবদুল বাকির, আহাম্মদ উল্লাহ, নায়েক আবুল হাশেম, আব্দুল হালিম বাসুসহ অনেকে। সারাদেশের বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নিয়ে মোট ১১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন লক্ষ্মীপুর থেকে।
হানাদারমুক্ত দিবস উপলক্ষে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকালে বাগবাড়ি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময়, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং মসজিদ–মন্দিরে দোয়া–প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
