
মো. ওমর ফারুক, লক্ষ্মীপুর : লক্ষ্মীপুর শহরে দ্রুত বাড়ছে বহুতল ভবন। একই গতিতে কমছে পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার। যত্রতত্র পুকুর ভরাটের কারণে শিশুদের খেলাধুলা, সাঁতার শেখা ও নিরাপদে সময় কাটানোর জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এতে শহরের পরিবেশ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্বাভাবিক জনজীবনও প্রভাবিত হচ্ছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় বহু পুকুর গত কয়েক বছরে ভরাট হয়ে গেছে। নতুন ভবন গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কমে যাচ্ছে সবুজ জায়গা ও খোলা মাঠ। তেরবেকী সড়কের স্কুলশিক্ষার্থী জুনাইদ নুহান বলল, ‘আগে গ্রীষ্মে পুকুরে সাঁতার শিখতাম। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম। এখন আশপাশে কোনো পুকুর নেই। ঘরেই সময় কাটাতে হয়।’
আব্দুল গণি হেডমাস্টার সড়কের বাসিন্দা রাফিয়া রেশমা বলেন, ‘পুকুর ভরাটের কারণে বর্ষায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। আগে যেসব পুকুর অতিরিক্ত পানি ধারণ করত, এখন সেখানে ভবন। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে যায়। শিশুদের বাইরে বের হওয়াও কষ্টকর।’
স্থানীয় শিক্ষক খোরশেদ আলম বলেন, খোলা জায়গা না থাকায় শিশুরা এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে। ‘পুকুর থাকলে তারা নিরাপদে সাঁতার শিখতে পারত। শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এর বড় ভূমিকা ছিল। এখন সেই সুযোগ হারিয়ে যাচ্ছে।’
শহরের বাসিন্দা আবুল হাসনাত মনে করেন, শিশুদের খেলাধুলার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে এর প্রভাব পুরো এলাকার ওপর পড়ছে। ‘বর্ষায় পানি নামার পথ নেই। চলাচল কষ্টকর হয়ে গেছে। বাড়ি পর্যন্ত পানি ঢোকে।’
পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বাবু বলেন, পুকুর শহরের জলধারণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং বন্যার পানি নামাতে ভূমিকা রাখে। ‘পুকুর কমলে জলাবদ্ধতা, পরিবেশগত ভারসাম্যহানি আর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। শিশুদের বিনোদন ও বিকাশও হুমকির মুখে পড়বে।’
অনেকে মনে করেন, পুকুর সংরক্ষণ করা হলে কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে সুইমিং পুল তৈরি হলে শিশুরা সাঁতার শেখার নিরাপদ জায়গা পেত।
লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী জুলফিকার হোসেন বলেন, পুকুর সংরক্ষণে পৌরসভার নীতি রয়েছে। ‘আমরা বেআইনিভাবে পুকুর ভরাট বা ভবন নির্মাণের অনুমতি দিই না। মালিকেরা কখনো পৌরসভা এড়িয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নেয়।’
অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, ‘অভিযোগ ভিত্তিহীন। কাগজপত্র যাচাই করে দেখি, পুকুরের ওপর ভবন নির্মাণের প্রমাণ মিললে অনুমতি দিই না।’
পৌরসভা সূত্র জানায়, জলাধার রক্ষা, ড্রেনেজ উন্নয়ন ও জলাশয় শনাক্তকরণের নানা পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন ধীরগতির কারণে অনেক পুকুর এখন ঝুঁকিতে রয়েছে।
শহরের মানুষ বলছেন, পুকুর ভরাটের প্রবণতা চলতে থাকলে একে একে হারিয়ে যাবে শিশুদের খেলার মাঠ, সাঁতার শেখার স্থান এবং প্রাকৃতিক জলাধার। এতে শহরের পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও শিশুর ভবিষ্যৎ—সবই বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
