
নাজমুল হোসেন : একসময় যে ড্রাগন ফল ছিল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, সেই ফল এখন ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে লক্ষ্মীপুরের মাটিতে। করোনাকালে শুরু করা সদর উপজেলার চররমনীমোহন এলাকার তরুণ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার মাজহারুল ইসলাম নাঈমের একটি উদ্যোগ আজ স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তৈরি করেছে নতুন কর্মসংস্থান। তার এই সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে পুরো জেলাজুড়ে কৃষিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।
করোনার দুঃসময়ে যখন বহু মানুষ কর্মহীন, তখনই কৃষিকে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন নাঈম। ২০২১ সালে ৩২০ শতাংশ লিজ নেওয়া জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে অনেকের কাছে এই উদ্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তা সফলতার মুখ দেখেছে। বর্তমানে চররমনীমোহনের বিস্তীর্ণ এলাকায় সারি সারি ড্রাগন গাছ আর লাল পাকা ফলে ভরে আছে একসময়ের পরিত্যক্ত ও অনাবাদি জমি।
মাজহারুল ইসলাম নাঈম বলেন, ‘করোনার সময় অনেকের বেকারত্ব দেখে কৃষির মাধ্যমে কিছু করার পরিকল্পনা করি। ইউটিউবের ভিডিও দেখে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হই। তবে শুরুতে এলাকায় এই চাষ নতুন হওয়ায় অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও নিজের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে ধীরে ধীরে সফলতা আসে।’
এখন নাঈমের বাগান দেখে অনেকেই কৃষিতে আগ্রহী হচ্ছেন।
নাঈম বলেন, ‘শুধু নিজেই আয় করছি না, অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছি—এটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
স্থানীয়রা জানান, আগে ড্রাগন ফল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ফলে দাম কমে এসেছে। স্থানীয় বাজারগুলোতে বর্তমানে প্রতি কেজি ড্রাগন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে কয়েক বছর আগেও এর দাম ছিল ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। ফল ব্যবসায়ী মো. সোহেল বলেন, ‘স্থানীয় বাগানের ফলে পরিবহন খরচ কমেছে, সরবরাহ বেড়েছে, আর সাধারণ ক্রেতারাও সুলভ মূল্যে ফলটি কিনতে পারছেন।’
ড্রাগন চাষে খরচ কম এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক। লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‘ড্রাগন ফল আমাদের আবহাওয়ার সঙ্গে বেশ মানিয়ে গেছে। নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় জেলায় এ ফলের আবাদ বাড়ছে। বাড়ির ছাদেও এটি চাষ সম্ভব। আমরা কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।’
নাঈমের বাবা নজরুল ইসলাম খান জানান, তারা সাধ্যমতো রাসায়নিক ব্যবহার এড়িয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে ফল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন, যা ফলের গুণগত মান ও চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি সহযোগিতা পেলে ড্রাগন চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। একই সঙ্গে তরুণদের কৃষিমুখী করে বেকারত্ব কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
