
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সকাল থেকে সন্ধ্যা—রোদে পুড়ে, কাদামাটিতে নেমে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে কাজ করেন তাঁরা। কিন্তু দিন শেষে মজুরি হাতে নিতে গেলেই চোখে পড়ে বৈষম্যের চিত্র। একই কাজ করেও পুরুষের তুলনায় প্রায় অর্ধেক মজুরি পান উপকূলের নারী শ্রমিকরা।
মহান মে দিবসে যখন বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকার নিয়ে নানা আলোচনা-সমাবেশ হচ্ছে, তখন সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগরে নারী শ্রমিকদের প্রধান দাবি—সমান কাজের সমান মজুরি।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কাঁকড়া খামার, মাছের ঘের, ধানক্ষেত, নদীতে রেণু আহরণ, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরা, মাটিকাটা, গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারসহ নানা কাজে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছেন নারীরা। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই তারা মজুরি বৈষম্যের শিকার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ধান কাটাসহ কৃষিকাজে একজন পুরুষ শ্রমিক দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পেলেও নারী শ্রমিক পান ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। কোথাও কোথাও এই ব্যবধান আরও বেশি।
ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট এলাকায় ধান কাটতে আসা শ্রমিকদের প্রায় অর্ধেকই নারী। সেখানে কাজ করা কুলসুম আক্তার বলেন, “স্বামীর আয়ে সংসার চলে না, তাই মাঠে নামতে হয়। কিন্তু পুরুষের সমান কাজ করেও অর্ধেক মজুরি পাই—এটা খুব কষ্টের।”
সোনাখালী গ্রামের সালেহা বেগম বলেন, “একই সময় একই কাজ করি, কিন্তু মজুরি নিতে গেলে বৈষম্য চোখে পড়ে। তখন খুব খারাপ লাগে।”
শুধু মজুরি নয়, কর্মঘণ্টা ও কর্মপরিবেশ নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়, কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।
স্থানীয় চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, “জমিতে পুরুষ-নারী দুজনই কাজ করে। তবে পুরুষকে ৫৫০ টাকা আর নারীকে ৩০০ টাকা দিই—এটাই প্রচলিত।”
উপকূলীয় এই অঞ্চলে শ্রমিক সংকটও রয়েছে। সুন্দরবনে প্রবেশে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক পুরুষ শ্রমিক অন্য এলাকায় চলে যান। ফলে কম মজুরিতে কাজ করাতে নারী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
দাতিনাখালি বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের পরিচালক শেফালী বেগম বলেন, “নারীরা এখন ঘরের কাজের পাশাপাশি মাঠেও সমান শ্রম দিচ্ছেন। কিন্তু মজুরি পাচ্ছেন অর্ধেক। অধিকাংশ নারী তাদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন নন। অনেকে জানলেও কাজ হারানোর ভয়ে কথা বলেন না।”
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাতক্ষীরার সাধারণ সম্পাদক জ্যোৎস্না দত্ত বলেন, “নারী-পুরুষ উভয়ই শ্রমিক। তাহলে মজুরিতে বৈষম্য কেন? সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”
শ্যামনগর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক বলেন, “এ অঞ্চলে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে, যা ইতিবাচক। তবে মজুরি বৈষম্য এখনো রয়েছে। সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে এটি কমানোর চেষ্টা চলছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, “নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করছে—এটা ভালো লক্ষণ। তবে কোনোভাবেই মজুরি বৈষম্য থাকা উচিত নয়।”
১৮৮৬ সালের শিকাগো আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে মে দিবসের সূচনা, তার মূল দাবি ছিল আট ঘণ্টা কর্মদিবস ও ন্যায্য মজুরি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দাবির অনেকটাই এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে উপকূলের নারী শ্রমিকদের জীবনে।
তাঁদের প্রত্যাশা—কেবল দিবস উদ্যাপন নয়, বাস্তবে যেন নিশ্চিত হয় সমান মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক হিসেবে ন্যায্য মর্যাদা।
