মুখোশে পেছনের চোখ, বাঘ ঠকিয়ে জীবন বাঁচান সুন্দরবনের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৯ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : বিশ্বের ভয়ঙ্করতম জঙ্গলের একটিতে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পা ফেলেন তারা। কেউ মাছ ধরেন, কেউ মধু সংগ্রহ করেন, কেউ কাঠ কেটে ফেরেন জীবনযুদ্ধে। মুখোমুখি হন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো ভয়ঙ্কর শিকারির। সুন্দরবনের গভীরে টিকে থাকার লড়াইয়ে স্থানীয়দের এক অভিনব কৌশল—মাথার পেছনে মুখোশ।
সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জের মৌয়াল আবুল হাসান (৪৫) এখনো বনে ঢোকার আগে মাথায় ঝুলিয়ে নেন একটি মুখোশ। সামনে নয়, পেছনে। পেছনে আঁকা দুটি বড় চোখ যেন সবসময় বনের ভয়ঙ্কর শিকারিকে তাকিয়ে দেখছে।

আবুল হাসান বলেন, “বাঘ সামনে থাকলে তবুও কিছু করার থাকে। কিন্তু পেছন থেকে এসে কামড়ে ধরে। মুখোশ পরলে বাঘ ভাবে আমরা তাকিয়ে আছি। তখন আর ঝাঁপিয়ে পড়ে না।”

১৯৮০-এর দশকে শুরু হয়েছিল এই পদ্ধতি। গবেষণায় দেখা যায়, বাঘ সাধারণত শিকারের পেছনে চুপিচুপি এসে আক্রমণ করে। চোখে চোখ পড়লে বা মানুষ তাকে দেখছে বুঝতে পারলে অনেক সময় বাঘ পিছিয়ে যায়। এই আচরণ বোঝেই স্থানীয়রা আবিষ্কার করেন মুখোশের কৌশল।
প্রথমদিকে এটি ছিল নিছক একটি জনবিশ্বাস। পরে বনবিভাগ ও বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকারী সংস্থার গবেষণায়ও দেখা যায়, মুখোশ ব্যবহারের পর বাঘের আক্রমণ ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে মুখোশ পরে বনে যাওয়া একটি উৎসাহিত কৌশলে পরিণত হয়।

তবে সময়ের সঙ্গে কৌশলও পুরোনো হয়ে যায়। মুখোশ দেখে বাঘ বিভ্রান্ত হয় না, বরং অনেক সময় আক্রমণ করেই বসে। স্থানীয়রা বলছেন, এখন মুখোশ আর আগের মতো কাজ করে না। ফলে অনেকে এখন শক্ত প্যাড, হেলমেট, জাল এবং গলায় প্রতিরক্ষামূলক গার্ড ব্যবহার করেন।

বনে ঢোকার আগে কেবল মুখোশ নয়, থাকে প্রার্থনাও। স্থানীয়রা বনবিবি ও দক্ষিণরায়ের পূজা দেন। কেউ কেউ দক্ষিণরায়ের মুখোশও মাথার পেছনে ঝুলিয়ে রাখেন।
জেলে ইসমাইল গাজী বলেন, “প্রাণ তো একটাই। মুখোশ পরি, বনবিবির দোয়াও নেই। এরপর বনের দিকে যাই।”

সুন্দরবনের বাঘ হিংস্রতার জন্য বিখ্যাত। সীমানা নির্ধারণে প্রস্রাব দিয়ে গন্ধ ছড়ালেও, জোয়ার-ভাটার কারণে সেই গন্ধ ধুয়ে যায়। ফলে তাদের মধ্যে ভয়, আগ্রাসন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়। ঝড়ের সময় বহু মৃতদেহ ও প্রাণী ভেসে আসে বনের ভেতরে—তা খেয়ে অনেক বাঘ নরখাদক হয়ে পড়ে।

বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন অন্তত ৪২৫ জন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৯৫ জন। তবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারই সরকারি তালিকার বাইরে থেকে যায়।
ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। নিহতদের পরিবার পায় সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা, আহতরা ৫০ হাজার। কিন্তু সেই টাকায় ফিরে আসে না হারানো স্বজন, মুছে যায় না জীবনের চিরস্থায়ী ভয়।

মুখোশের কৌশল হয়তো এখন আগের মতো কার্যকর নয়, কিন্তু এটি থেকে যায় টিকে থাকার এক প্রতীক হিসেবে। এটি শুধু একটি কৌশল নয়, বরং মানুষের বুদ্ধি, সাহস ও প্রবল সংকল্পের এক অনন্য উদাহরণ।