বেদনার মাঝেও নীরব আলো

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

আলামীন  : রবিবারের বিকেলটা আর দশটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রুবেলের হাতে ছিল সংসারের স্বপ্ন—চোখে ছিল সন্তানের আগামীর ছবি। নতুন বিয়ে করা এই মানুষটার জীবনে তখন দায়িত্ব আর ভালোবাসা একসাথে বড় হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ এক সড়ক দুর্ঘটনা—এক মুহূর্তেই থামিয়ে দিল সব চলমান স্বপ্ন।

খবরটা পৌঁছাতেই আরমিনা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কোলে ছোট্ট রুবাইয়া, সামনে অচেনা অন্ধকার। মানুষ ভিড় করল, সান্ত্বনার কথা বলা হলো—কিন্তু শূন্যতা কি কোনো শব্দে ভরে?

রুবাইয়া তখনও বুঝতে শেখেনি মৃত্যু মানে কী। সে এখনো মাকে জিজ্ঞেস করে—

“আব্বা কোনদিন আসিবে?”

মা কোনো উত্তর দিতে পারে না। বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে গেলেও সে সত্যিটা বলতে সাহস পায় না—কারণ কীভাবে বলা যায়, বাবা আর কখনো ফিরবে না?

রুবেলের মা—বৃদ্ধা এক নারী—ছেলের অকাল মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন। দিনভর রাতভর তাঁর কান্না থামে না। নিজের সন্তানকে হারানোর শোক যে কতটা ভারী, তা চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। আরমিনা আর রুবাইয়া এখন নানার বাড়িতে। আদরে-যত্নে রুবাইয়া বড় হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাবার শূন্যতা কোনো আদরেই পূরণ হয় না।

আর আরমিনা—সে সবার জন্য শক্ত থাকার চেষ্টা করে। মেয়েকে আগলে রাখে, শ্বশুর-শাশুড়ির দুঃখের ভার নেয়। কিন্তু নিজের ক্লান্তি, নিজের কান্না—সব লুকিয়ে রাখে। আড়ালে, নিঃশব্দে, সে কাঁদে। কারণ রুবেল যে আর ফিরবে না—এই সত্যটাই সবচেয়ে বেশি পোড়ায়।

কিছুদিন পর, একদিন এলেন বিআরটিএ কল্যাণ ট্রাস্ট–এর প্রতিনিধিরা। ফরম পূরণ হলো, নিয়ম মেনে এগোল প্রক্রিয়া। এরপর এক অনুষ্ঠানে আরমিনার হাতে তুলে দেওয়া হলো পাঁচ লক্ষ টাকার একটি চেক। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সহানুভূতির মানুষগুলো।

চেকটা হাতে নিয়েও তার চোখের পানি থামল না। কেউ জিজ্ঞেস করতেই ভাঙা কণ্ঠে সে বলল—

“অর্থ পেলাম… কিন্তু যে মানুষটা স্বপ্ন দেখত, সে তো আর ফিরবে না।”

টাকার অঙ্ক বড় হতে পারে, কিন্তু স্মৃতির শূন্যতা তার চেয়েও গভীর। এই চেক কোনোদিন বাবার হাত ধরে হাঁটার স্মৃতি ফিরিয়ে দেবে না, কোনোদিন রুবাইয়াকে “আব্বা” ডাকে সাড়া দেবে না। চেকের এক পাশে আশ্বাস, আরেক পাশে অঝোর কান্না—যে কান্না কোনোদিনই পুরোপুরি শুকাবে না।

তবু এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে। সহানুভূতির হাত বাড়িয়েছে, দায়িত্বের বোঝা একটু হলেও ভাগ করে নিয়েছে। দুঃখ কমেনি, ক্ষত শুকায়নি—কিন্তু একা থাকার ভয়টা কিছুটা কমেছে।

হাসি এখনো ফেরেনি মুখে, তবে চোখের জল মুছে আরমিনা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে—রুবেলের স্মৃতিকে বুকে নিয়ে, রুবাইয়ার ভবিষ্যতের দিকে।

কারণ কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি জন্ম নেয় সবচেয়ে গভীর বেদনা থেকেই।

আর সেই শক্তিই—নীরব আলো হয়ে—অন্ধকারের ভেতর পথ দেখায়। ( রচনাধীন একাংশ)